সাবাশ বাংলাদেশ যাও সামনে এগিয়ে

0
10

অনলাইন ডেস্ক।।
গেল সপ্তাহে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ। না, বরাবরের মতো লঞ্চ ডুবি কিংবা ভবন ধসের খবর নয়, কোনরকম সহিংসতার খবরও নয়, দুর্নীতি প্রতারণার খবরও নয়। বাংলাদেশের কিশোর তরুণ দিন বদলের স্বপ্নে বিভোর। ১৩ নভেম্বর খবর এসেছে পৃথিবী নামের গ্রহটাকে শিশু কিশোরদের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য করার যুদ্ধে নেমে শিশুদের নোবেলখ্যাত বিশ্ব শিশুশান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে চিত্রা নদীর পাড়ের এক সাধারণ পরিবারের ছেলে সাদাত রহমান। ১৫ নভেম্বর আবারও সুসংবাদ আসে দক্ষিণ গোলার্ধ হতে। স্নাতকোত্তরে সর্বকালের সেরা ফলাফল, সকল বিষয়ে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সেরা বিদেশি শিক্ষার্থীর খেতাব পেয়েছে পাহাড় সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রামে বড় হওয়া মেয়ে রুবাইয়াৎ সরওয়ার।
নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অপূর্ব সাক্ষ্যবহনকারী মিলনায়তনে চমৎকারভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে আয়োজন করা হয়েছিল দু’হাজার বিশ সালের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিতরণী সভা। লন্ডন থেকে অন্তর্জালের মাধ্যমে সংযুক্ত হয় দু’হাজার তের সালে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও দু’হাজার চৌদ্দ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সোয়াত উপত্যকার হার না মানা কন্যা মালালা ইউসুফজাই। মালালা যখন এবছরের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে বাংলাদেশের নড়াইল ভলান্টিয়ার্সের সাদাত রহমানের নাম ঘোষণা করছিল, মনের অজান্তেই চোখ ভিজে উঠছিল। মালালা’র বয়ানে সাদাতের কীর্তির কথা শুনে অভিভূত, আনন্দিত, গর্বিত। অক্টোবর জুড়ে বাংলার পথে প্রান্তরে তরুণ যুবাদের পৈশাচিকতার তাণ্ডবে পাজর ভাঙা স্বপ্নগুলো আবারও ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। সাদাত দেখিয়ে দিয়েছে মুঠোফোনে মুখ গুঁজে রাতের ঘুম, দিনের কাজ ফেলে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়, তথ্য প্রযুক্তির সদব্যবহার করে মানব কল্যাণের জন্যই তথ্য প্রযুক্তি।
অন্তর্জালের দুনিয়ায় মরণ ফাঁদ পাতা শিশু কিশোরদের জন্য। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত পাড়া গাঁ থেকে মার্কিন মুলুক- সর্বত্রই বিস্তার করে আছে প্রতারণার জাল। অনেকেই ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছে, জীবন গেছে অনেকের। সাদাত তা মানতে পারেনা। কিছু একটা করতেই হবে। সমমনা বন্ধুদের নিয়ে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামে নতুন সংগঠন তৈরি করে। অন্তর্জাল প্রতারণা নির্মূলে তৈরি করে বিশেষ অ্যাপ ‘সাইবার টিন’। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী তথ্য প্রযুক্তির নাড়ি নক্ষত্র বের করে শিশু কিশোরদের জন্য বাঁচার পথ খোঁজে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো সাদাতও ঠিক করে- প্রযুক্তি নির্ভর অপকর্ম মোকাবেলায় প্রযুক্তিই হবে ওর প্রধান হাতিয়ার। প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূর্ণ সমর্থন জানায় সাদাতকে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। বাহ এমন বাংলাদেশইতো চাই।

সব মানুষের মাঝেই লুকিয়ে থাকে একজন করে ‘সুপার হিরো’- একজন পোস্ট মাস্টার বাবা ও গৃহবধূ মায়ের সন্তান, মফস্বল শহরে বড় হওয়া সতের বছরের কিশোর, নড়াইল আবদুল হাই সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সাদাত রহমান এমন কথা বলা শিখল কেমন করে! কী সপ্রতিভ সেই কিশোর! দরবার কক্ষের সুউচ্চ ছাদ দেখেই ঘাবড়ে যাওয়ার কথা। তদুপরি চারপাশে বড় বড় মানুষেরা। অথচ কী সাবলীল ভাবে হেঁটে গিয়ে মালালা’র ভার্চুয়ালি এগিয়ে দেওয়া পদক গ্রহণ করে শূন্যে তুলে উল্লাস প্রকাশ করে সাদাত। পুরো দৃশ্যে সে এত পরিণত, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর! ভাষণ দেবার সময় যথার্থ বক্তা; ঠিক যেন বড় মানুষ। শুরু থেকে শেষ অবদি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ধারক। ‘সবাই ভাল থাকবেন’ সাবলীলভাবে বাংলায় উচ্চারণ করে বক্তৃতা সমাপ্ত করে সাদাত। দেশকে তুলে ধরে সে বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে।
সাদাতের কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্রটি অন্য এক বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছে বিশ্বের দরবারে। ওর সহপাঠী ও সহযোদ্ধাদের দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায়না। কেবলমাত্র পরীক্ষায় উচ্চ নম্বর পাওয়ার আশায় দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা কিংবা নিজেকে অনেক বেশি আধুনিক হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য আইফোন স্মার্টফোনে অর্থহীন সামাজিক যোগাযোগে আঁটকে রাখা প্রজন্মের সামনে নতুন অনুপ্রেরণা সাদাত ও তার বন্ধুরা। চিত্রা নদীর পাড়ের একদল কিশোর কিশোরী পারলে বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, তিতাস, মধুমতি পাড়ের ওরা কেন পারবেনা?
সাদাতের আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার পাওয়ার খবর আসার ঠিক দুই দিন পর সুখবর আসে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া হতে। কর্ণফুলীর পাড়ের রুবাইয়াৎ সরওয়ার ১৫ নভেম্বর- অর্জন করেছেন ‘শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল শিক্ষার্থীর পুরস্কার’। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে। স্নাতকোত্তরে এখন পর্যন্ত সকল বিষয়ে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর তাঁর। পুরস্কার হিসেবে জিতে নিয়েছেন ‘গভর্নর অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২০’। মিষ্টি হলদে সবুজ জামদানী শাড়ি পরে রুবাইয়াতের পুরস্কার গ্রহণ করার অপূর্ব সে দৃশ্য আমাদের তরুণদের বুকে স্বপ্ন জাগিয়ে দেবে বলে বিশ্বাস করি। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে বিদেশের মাটিতে এমন করে দেশকে তুলে ধরা যায়না।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডাঃ খাস্তগির সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ, ঢাকার টেঙটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে তিনি পৌঁছে গেছেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিতর্ক, গান, ছবি আঁকার পাশাপাশি গৃহহীনদের জীবনধারা পাল্টে দেওয়ার আয়োজনে নিজের লেখা, আঁকা ও তোলা ছবির মাধ্যমে ভাবনা তুলে ধরেও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন আর ঝুলিতে ভরেছেন ডন ডানস্টেন ফাউন্ডেশন পুরস্কার।
অস্ট্রেলিয়া গমনের আগে রুবাইয়াৎ বাংলাদেশের টেঙটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। সকল কাজ থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়কারী রুবাইয়াৎ বলছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশের তরুণদের কাজ করার সুযোগের কথা, অপার সম্ভাবনার কথা। নিজ চোখে সমস্যা দেখে নিজ থেকেই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করার সুযোগ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের তরুণদেরই আছে। উন্নত বিশ্বে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া প্রজন্মের দেশের জন্য কাজ করার তেমন কোন সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই হয়তো।
কিন্তু আমাদের যে অনেক কাজ, অনেক দূর যেতে হবে। অনেক দাম দিয়ে কেনা প্রাণের বাংলাদেশের অর্ধশতবার্ষিকী পালনের প্রাক্কালে সাদাত রুবাইয়াৎ তাই আমাদের স্বপ্ন দেখায়, আলোর পথ দেখিয়ে দেয়। পরিণত প্রজন্ম যখন ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার পৃষ্ঠপোষকতায় মত্ত, উচ্চপদে বহাল অধিকাংশ পেশাজীবী যখন দেশ ও মাটির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে কেবল নিজেদের আখের গোছানতে ব্যস্ত, তখন সাদাত রুবাইয়াৎ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তারুণ্যের শক্তি। ওরা যেন ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’, যদিও আমাদের গণমাধ্যমে তেমন গুরুত্ব পায়নি ওদের গল্প ও স্বপ্নগাঁথা। কোন কাগজেই প্রধান শিরোনাম হতে পারেনি সাদাত রুবাইয়াতের গল্প।
সাদাত রুবাইয়াতের জন্য এক পৃথিবী ভালোবাসা ও নিরন্তর শুভকামনা। ওদের আগামীর পথচলা সুন্দর হোক, নির্মল হোক। হোক নিষ্কণ্টক। আমাদের চাই আরও আরও সাদাত রুবাইয়াৎ। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক সাদাত রুবাইয়াৎ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here