June 22, 2021, 11:37 am

চলার পথে স্টেশনে

অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী ।।
শিখা ,মিনা ,সুমন ,মাসুদ । নামগুলাে তাদের বাবাদের দেয়া কিনা জানি । হয়তাে ভালাে লেগেছে , তাই নামগুলাে ওরা নিজেরাই রেখেছে । বনের পাখ – পাখালির মত এরাও আশ্রয় করে নিয়েছে । বেড়ে উঠেছে স্টেশন , বাসটার্মিনাল ও মহাসড়কে এ যাত্রী ছাউনিতে ওরা এগারােজন হয়তাে বা আরও বেশি । জীবনের কোন বড় জলােচ্ছাসে ওরা ভেসে একত্রিত হয়েছে । কেউ জানে না , এক পরিবার নয় , কিন্তু এক অদ্ভুত রহস্যের টানে ওরা এক সঙ্গে থাকে । হেসে খেলে জীবন কাটায় । কারাে বয়স সাত কি আট । কারাে তের কি চৌদ্দ যেন ওরা এক একটি ফুল । যেন এক গুচ্ছফুল হয়ে আছে । প্রকৃতির নিদর্শন হয়ে । হাজার চোখের সামনে থেকে যেন রয়েছে । চোখের আড়ালে আমরা দেখেও দেখছি না , তাই তারা গুরুত্বহীন । যখন ট্রেন এসে থামে । ওরা যে যার মত চুপটি করে উঠে পড়ে বিভিন্ন বগিতে । আবার আপ ও ডাউন ট্রেনের নামও জানে ওরা । সাত সকালে আপ ট্রেন গােয়ালন্দ মেইল এসে হাজির হয় । কেউ কেউ উঠে পড়ে ওই ট্রেনের বগিতে । আসে কপােতক্ষ , রূপসা , সাগরদাড়ি ইত্যাদি ওদের প্রধান লক্ষ্য । অভিনব অভিনয়ে হাতেপাতে ওরা যাত্রীদের সামনে । কাতর ভঙ্গিতে দু – একটি সত্য বা মিথ্যা বলতে পারে । কিছু পয়সা পাই , কিছু খেতে পারে । ট্রেনের বগিতে বগিতে ছুটে বেড়িয়েই কাটে দিন । সপ্তাহ । মাস । বছর । পাঁচ বা দশ টাকা করে যে যা দেয় । তাতেই ওদের রােজগার উপার্জন উঠে আসে । এই টাকাতেই ওরা এটা ওটা কিনে খাই । কখনােই তারা খাওয়ার বাসনা অপূর্ণ রাখে না । হাতে টাকা আসা মাত্রই টুক করে চলে যায় স্টেশনের দোকানে কিংবা হােটেলে । নানরুটি , বার্গার , চিপস্ কোমল পানীয় , আইসক্রিম- এ সব খায় । ইচ্ছে হলেই পথের দু – একটি জিনিসও কিনতে পারে । তারপর গাছতলা কিংবা স্টেশনের দেওয়াল ঘেষে তারা ঘুমোয় । দিনের কোলাহল শেষে যখন রাত আসে । এই স্টেশনেই তারা জড় হয় সবাই । সারাদিন কার কত উপার্জন হয়েছে , কেউ হিসাব মিলিয়ে দেখেনা কারন কোন টার্গেট থাকে না যে এত টাকা উপার্জন করতে হবে । ওদের কোন বস্ নেই যে ওদের উপার্জিত টাকার উপর ভাগ বসাবে । যে যা পাই তাই নিয়ে সন্তষ্ট । একটি দিন কেটে যাবার পর পরের দিনটি কেমন যাবে এই ভাবনাতেই চোখে নেমে আসে ঘুম । আকাশে তখন জ্বলে চাঁদ কিংবা চাঁদহীন রাতে লাখাে তারা । কারও মনেই জমানাের কোনাে ইচ্ছেই নেই । কেন থাকবে ? কার জন্য জমাবে ? না আছে মা , না আছে । বাবা , না আছে ভাইবােন । ফলে নেই কোনাে ভবিষ্যতের চিন্তা । তারপরও ঘুমােতে যাওয়ার আগে চোখের সামনে হয়তাে ভেসে ওঠে অস্পষ্ট মায়ের মুখটি রােগাপাত্তুরে আর অসহায় সেই মুখটি মনে হতেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে । স্মৃতির অতুলে হারিয়ে যাওয়া মায়ের ঘ্রাণ নিতে নিতে হয়তাে ঘুম আরাে গভীর হয় । কোন কোন দিন মা হয়তাে স্বপ্নে এসে কপালে টিপ দিয়ে যায় । মায়ের এটুকুই স্পর্শেই শীত কিংবা ঝড়ের রাতে ওরা থাকে নিরাপদ । হয়তাে বা কারাে কারো চোখের সামনে ভেসে উঠে কোনদিন না দেখা বাবার মুখটিও । এই বয়সে পাখির ছানার মত মায়ের আঁচলের তলে থাকার কথা ছিল । কথা ছিল বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার । ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নে বিভাের হয়ে থাকর কথা ছিল । কিন্তু না- , প্রতারক নিয়তি ওদের ফেলে রেখে গেছে এই মাঝে মাঝে জনশূন্য স্টেশনে । স্টেশনের পূর্ব পার্শ্বে জেলা ক্রীড়া সংস্থা সেখানে বাচ্চাদের সাঁতার শেখানাের সুইমিংপুল । মাঠে চলে ফুটবল ,ক্রিকেট প্রশিক্ষণ । তার পার্শ্বে বীজ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র । পশ্চিম পার্শ্বে গমপট্টি ও মাছপট্টি এবং বিদ্যুৎ অফিস চুয়াডাঙ্গা জংশন অফিস । উত্তর দক্ষিণ দিক রেলওয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার অফিস । সবাই আছে যার যার কাজকর্ম আর বৈষয়িক জীবন নিয়ে ব্যস্ত । কারও সময় নেই এই নাম পরিচয়হীন মানব শিশুদের নিয়ে চিন্তা করা । ওরা কোথায় গােসল করে , কোথায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যায় । প্রবল বর্ষণ কিংবা কাল বৈশাখীর রাতে , পথের পার্শ্বে,গাছের তলায় কিংবা স্টেশনের ছাউনিতে কিভাবে ঘুমায়! ঘুমােতে কি পারে ? কিন্তু মা – বাবার আদর স্পর্শ থেকে বঞ্চিত এই শিশুদের কোমল হাতগুলাে হয়ে উঠতে পারে অপরাধীর হাত ।তারা জড়িয়ে পড়তে পারে চুরি – ছিনতাই , মাদকাসক্তিতে , মাদক কেনাবেচা , খুন – ধর্ষণসহ অপরাধে। শুধু এই চুয়াডাঙ্গা স্টেশনেই নই দেশের বিভিন্ন স্টেশনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শত শত এ ধরনের মানব শিশু । আমাদের সমাজ , কিংবা রাষ্ট্র কি এদের নিয়ে চিন্তা করে ? এদের কিভাবে পুনর্বাসন করা যায় ! তারাও এই সমাজেরই সন্তান , এ রাষ্ট্রের সদস্য এবং পূর্ণবয়স্ক নাগরিক হবে একদিন । এই ভাবনা কি – আমাদের আছে ? তাদের প্রতি কি রাষ্ট্রের কোনাে কর্তব্য নেই ? স্টেশন কর্তৃপক্ষ কি তাদের দেখে ? চলতি পথে স্টেশনে তাদের হাসি তামাশা দেখে একটু দাড়ায় উৎসুক দৃষ্টিতে । হয়তাে এক মুহূর্তে ওদের নিয়ে ভাবি । কিন্তু এ পর্যন্তই । এই পথশিশুদের দেখভাল করার বা তাদের পূর্নবাসন করার কথা কি কেউ ভাবে ? ওদের জন্য কি আমাদের কিছুই করার নেই ? ওরা কি আমাদের এই সামজের,এ রাষ্ট্রের কেউ নই ? এই পৃথিবীর কেউ নই ? ওরা কি ভিন্ন গ্রহ থেকে এসেছে ? ওদেরকে নিয়ে ভাবলে মানবতা বিকশিত হবে ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ:
BengaliEnglish