June 25, 2021, 4:05 pm

ফিলিস্তিন ইসরায়েল: টিকটক সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে ভাইরাল হচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক।।

ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি তরুণ প্রজন্ম সংঘাতের ছবি স্মার্টফোনে তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, তত সেই উত্তেজনা প্রকাশের একটা বড় মাধ্যম হয়ে উঠছে সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও অ্যাপ টিকটক।

এই ভিডিও অ্যাপ একসময় সুপরিচিতি ছিল ভাইরাল হওয়া নাচ-গানের ভিডিওর জন্য। নাচ-গানের ভিডিও শেয়ারের এই সামাজিক প্ল্যাটফর্ম এখন ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের তরুণ প্রজন্মের জন্য খবর শেয়ার করার একটা গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম হয়ে উঠেছে।

চীনা মালিকানাধীন এই সাইট তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী এই অ্যাপ সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে মাসে প্রায় ৭০ কোটি তরুণ।

ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া রকেটের ফুটেজ, ইসরায়েলি হামলায় গাযা বিধ্বস্ত হওয়ার এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদের নানা ছবি এই সাইটে এখন ভাইরাল হয়েছে। এর মাধ্যমে সংঘাতের চিত্র দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে।

পাশাপাশি এমন উদ্বেগও বাড়ছে যে, সামাজিক মাধ্যম ছড়িয়ে দিচ্ছে ভুয়া তথ্য বা উগ্রবাদ।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস
ইসরায়েলের আরব নাগরিকরা কী ধরনের বৈষম্যের শিকার?
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সহিংসতা চরমে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে গাযা এবং ইসরায়েলের মধ্যে এটাই ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে তীব্র সহিংসতা।

পূর্ব জেরুসালেমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা বাড়ার পটভূমিতে এবারের লড়াইয়ের সূত্রপাত। এই সংঘাত চরমে ওঠে যখন মুসলিম ও ইহুদী দুই ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র একটি স্থানে সংঘর্ষ শুরু হয়।

গাযা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস গোষ্ঠী ওই এলাকা থেকে ইহুদিদের সরে যাবার হুঁশিয়ারি দেবার পর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ শুরু করে। ইসরায়েলও পাল্টা জবাবে বিমাান হামলা চালাতে শুরু করে।

এমনকি সাম্প্রতিক লড়াই শুরুর আগেও ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে উত্তেজনার খবর টিকটক-এ ভাইরাল হতে শুরু করে।

এপ্রিল মাসে পূর্ব জেরুসালেমের বাসিন্দা দুই ফিলিস্তিনি তরুণের গণপরিবহনে দুজন কট্টরপন্থী ইহুদি তরুণকে চড় মারার ভিডিও এই অ্যাপে ভাইরাল হয়। পরের সপ্তাহে পুলিশ সন্দেহভাজন দুজন তরুণকে গ্রেপ্তার করে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদের ক্লিপও টিকটক-এ ছড়াতে শুরু করে। অ্যাপ ব্যবহারকারীরা #SaveSheikhJarrah #সেভশেখজারাহ এই হ্যাশট্যাগে ভিডিও পোস্ট করে। পূর্ব জেরুসালেমের এই শেখ জারাহ এলাকা থেকেই ফিলিস্তিনি পরিবারদের উচ্ছেদের হুমকি থেকে এবারের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। এই ভিডিওগুলো এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ দেখছে এবং শেয়ার করছে।

টিকটক বুম: চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পরাশক্তির সামাজিক মাধ্যম দখলের লড়াই নামে বইয়ের লেখক ক্রিস স্টোকলি-ওয়াকার বিবিসিকে বলছেন যে, টিকটক ব্যবহার করা যেহেতু খুবই সহজ এবং এই অ্যাপ যেহেতু ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়, তাই এই মাধ্যমের কন্টেন্ট ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে যায় খুবই দ্রুত।

“এই অ্যাপে ভিডিও তৈরির পদ্ধতি এবং সরঞ্জামগুলো খুবই সহজ -এতই সহজ যে ১২ বছর থেকে শুরু করে ৯০ বছর বয়সের যে কেউ নিজেই, প্রযুক্তি বিষয়ে তেমন কোন জ্ঞান না থাকলেও এই অ্যাপে ভিডিও বানাতে পারে,” তিনি বলেন। “আর এই অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বিশাল- আমরা জানি যে সারা পৃথিবীতে নিয়মিত টিকটক ব্যবহার করে মাসে ৭৩ কোটি বিশ লাখ মানুষ। কাজেই টিকটক-এ আপ যদি কিছু পোস্ট করেন, তা প্রচুর মানুষ দেখবে এটা বাস্তবতা।”
কেন হঠাৎ করেই তেতে উঠেছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত
ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে দশটি প্রশ্ন
জেরুজালেমে কেন প্রার্থনার স্থান নিয়ে দ্বন্দ্ব?
একটি ভিডিওর ছবিতে দাবি করা হচ্ছে গাযায় ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে বাঁচতে পালাচ্ছে গাযার মানুষ। এই হ্যাশট্যাগ দিয়ে ভিডিওটি পোস্ট করেছে ‘মুসলিম’ নামে আমেরিকার একটি নিউজ সাইট, যে ভিডিওটি টিকটক-এ দেখা হয়েছে চার কোটি ৪০ লক্ষ বার।

সাব্রিনা আবুখদিয়ের নামে আরেকজন টিকটক ব্যবহারকারীর আরেকটি পোস্ট দেখেছে ১৫ লাখ মানুষ। এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে গাযার একটি বিধ্বস্ত বহুতল আবাসিক ভবন এবং ক্রন্দনরত শিশু- সাথে তার লেখা পোস্ট- “আপনারা জানেন কী করতে হবে,”। তিনি এই ভিডিওটি সবার সাথে শেয়ার করার অনুরোধ জানিয়েছেন। টিকটক ব্যবহারকরী এবং একইসঙ্গে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ সাইট যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটারেও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘাতের ফুটেজ এবং গাযার ভেতরকার পরিস্থিতির ভিডিও ছবির সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে #সেভশেখজারাহ হ্যাশট্যাগ।

পশ্চিম তীরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে বেরিয়ে আসা ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলের সমর্থকরাও টিকটক-এ তাদের পোস্ট দিচ্ছে। একটি ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ছোঁড়া পাথর থেকে এক ফিলিস্তিনি নারীকে আড়াল করে রেখেছে একজন ইসরায়েলি সৈন্য। টিকটক-এ এই ভিডিওটিও দেখেছে ১৫ লাখের ওপর মানুষ।

অনলাইনে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ-এর জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। টুইটারে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ১৩ লাখ এবং টিকটক-এ তাদের অনুসারী রয়েছে ৭০ হাজারের ওপর। তারাও ইসরায়েলের ভেতরকার চিত্র এবং ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণের ভিডিও টিকটক-এ পোস্ট করছে।

“এটা আপনার শহর হলে আপনি কী করতেন?” এমন প্রশ্ন তুলে টিকটক-এ পোস্ট করা তাদের একটি ভিডিও দেখেছে ৩ লাখ মানুষ।

ইসরায়েলে হাইফা ইউনিভার্সিটির ড. গ্যাব্রিয়েল ওয়েইমান বলেছেন অনলাইনে এখন “হৃদয় ও মনের লড়াই চলছে” এবং এই মুহূর্তে “এটা অসম লড়াই”।

“ইসরায়েলের দিক থেকেও সমানতালে পাল্টা পোস্টিং হচ্ছে, কিন্তু আমি বলব সেগুলো তেমন শক্তিশালী নয়, এবং মোটেও সুসংগঠিত নয়, এবং আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব সেগুলো তেমন মানুষের বিশ্বাস তৈরি করে না,” তিনি বিবিসিকে বলেন। “হয়ত ইসরায়েলে কেউই মনে করেনি যে টিকটক একটা শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।”

জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করবে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা, এ রকম হুমকির কারণে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ার জের ধরেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত

এ মাসে টিকটক এবং টুইটার-এ একটি ভিডিও ভাইরাল হয় যেখানে দেখা যায় জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদ চত্বরে যখন একটি গাছ পুড়ছে, তখন তা দেখে নাচছে এবং উল্লাস প্রকাশ করছে ইহুদিরা। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা দাবি করে মসজিদ ধ্বংস হওয়ায় তারা উল্লাস প্রকাশ করছে।

বাস্তব ঘটনা ছিল, ওই ইহুদিরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন জেরুসালেম দিবস উদযাপনের জন্য। আগুনে মসজিদের কোন ক্ষতি হয়নি।

ইসরায়েলি পুলিশ ওই ঘটনার দোষ চাপায় ফিলিস্তিনিদের ওপর। তারা বলে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ছোঁড়া আতসবাজিতে আগুন লেগেছে, আর প্রতিবাদকারীরা বলে ইসরায়েলি সেনা অফিসারদের ছোঁড়া স্টান গ্রেনেডে থেকে আগুনের সূত্রপাত।

বৃহস্পতিবার রাতে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেনি গানৎয ফেসবুক এবং টিকটক-কে তাদের সাইট থেকে এসব পোস্ট সরিয়ে ফেলতে বলেন। তিনি বলেন এসব পোস্ট সহিংসতায় আরও উস্কানি যোগাবে।

তিনি বলেন উগ্রপন্থীরা সামাজিক মাধ্যমে ইচ্ছা করে এসব ছড়াচ্ছে এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তিনি সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোর “সহযোগিতা আশা” করছেন।

সংবাদ ওয়েবসাইট ইসরায়েল ন্যাশানাল নিউজ জানায় দুটি সংস্থার নির্বাহী কর্মকর্তারাই “তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহিংসতা ছড়ানো বন্ধে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের” প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ভুয়া ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য অনলাইনে ছড়ানো প্রতিরোধে গড়ে তোলা একটি সংস্থা, ফার্স্ট ড্রাফট নিউজে কাজ করেন শেদানে আরবানি।

“আমরা যেসব কন্টেন্ট দেখেছি তার মধ্যে অনেকগুলোই পুরনো সংবাদ মাধ্যম থেকে নেয়া পুরনো খবর, যেগুলো অপ্রাসঙ্গিকভাবে পোস্ট করা হয়েছে,” তিনি বিবিসিকে বলেন।

তিনি বলেন দু পক্ষ থেকেই সম্পূর্ণ অন্য সময়ের খবর এবং ভিন্ন জায়গার খবর ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়ানো হচ্ছে।

ইসরায়েল ফিলিস্তিন লড়াইয়ে আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বিশেষ করে সামাজিক ভিডিও অ্যাপ টিকটক।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ:
BengaliEnglish