বিশ্বকাপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না

সংগ্রাম মিত্র ( কলকাতা )।।
একমাস ধরে সারা বিশ্ব ফুটবল জ্বরে ভুগছিলো,তার পরিসমাপ্তি ঘটলো গত রবিবার আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের ম্যাচ দিয়ে।
অসাধারণ এক বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলায় মেতে উঠলো সমগ্র বিশ্ব তথা আপামর বাঙালি।তাই তো প্রবাদ প্রতিম গায়ক অত্যন্ত দরদ দিয়ে “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”,গানটি গেয়ে বাঙালির উচ্ছাস কে মেলে ধরেছেন।কি ভীষণ উত্তেজনা, সময়ের সাথে সাথে অনেকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। কাজকর্ম ফেলে সন্ধ্যে হলেই টিভির সামনে প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসেছিল প্রায় সমগ্র বিশ্বের মানুষ।
কথায় আছে সারা বিশ্বে বাঙালির মতো হুজুগে জাতি আর একটা আছে বলে মনে হয় না।গত রবিবার সুদূর কাতারে হচ্ছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল। যেখানে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা খেলেছে।টানটান উত্তেজনা পূর্ণ ম্যাচে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জয়ী হলো। দারুন উপভোগ্য ম্যাচ।কাতারে বিশ্বকাপ হয়েছে,জয়ী হয়েছে আর্জেন্টিনা কিন্তু উন্মাদনার রেশ আর্জেন্টিনাকে ও ছপিয়ে গেছে কোলকাতা। ফেসবুক জুড়ে নীল সাদা রঙের উজ্জ্বলতা। দেওয়াল জুড়ে নীল সাদা রঙের ঢেউয়ে শহর ঢেকে গেছে।কোথাও বা মেসি নেইমার দের মূর্তি আঁকা হয়েছে। ব্যানার,ফেস্টুনে পতাকাতে মুড়ে দেওয়া হয়েছে বাংলা জুড়ে বললেও ভুল হবে,একই উন্মাদনা বাংলাদেশ।দখল করেছে অলি-গলি,রাজপথ,এমন কি বাড়ির ছাদ। নিজেদের দেশের পতাকা বাড়ির ছাদে কিংবা রাস্তার মোড়ের মাথায় থাক বা না থাক, আর্জেন্টিনা ব্রাজিল ফ্রান্সের পতাকা দেখে মনে হবে মেসি নেইমাররা একেবারে নিখাদ বাঙালির ঘরের ছেলে। ক্রিকেট খেলা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু কোনদিন ভারতের পতাকা নিয়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের জনগণের মধ্যে এমন উন্মাদনা দেখতে পাবো কোনদিন?
আবার এই ভারতবর্ষে ১৫ ই আগস্টে ভারত সরকার হার ঘর তিরঙ্গা লাগানোর অভিযান নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছিল।আসলে বিশ্বকাপে খেলছে কারা? আর্জেন্টিনা নাকি আমাদের ভারত?তবে আর যাই হোক,আমরা সবাই জানি বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারতের ভাগ্যদেবতা আর কোনদিন প্রসন্ন হবে না।
১৯৪৮ সালে মহা সুযোগ এলেও তৎকালীন ভারত সরকার তা কোমায় পাঠিয়ে দেন।এক্ষেত্রে এই ইতিহাস একটু বর্ণনা করা দরকার, দুঃখ জনক বিষয় হল এই বিশ্ব কাপ খেলায় বিশ্বের বহু দেশ মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে তাদের জনসংখ্যা হয় তো কোটি ছাড়াইনি।আর ভারত প্রায় ১৩০ কোটির দেশ সেখানে দর্শক।কারণ পাকিস্তান_ইন্ডিয়া, ধর্ম_ ধর্ম,নোংরা রাজনীতি,আর দুর্নীতির খেলা খেলতে গিয়ে ফুটবল মোহন বাগান ,ইস্ট বেঙ্গলের গণ্ডি টপকে বিশ্বের দরবারে আর পৌঁছাতে পারেনি আজও।তার সঙ্গে ভারত বর্ষের ফুটবল ভবিষ্যত ধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল তৎকালীন জহর লাল নেহেরুর কংগ্রেস সরকারের স্বার্থন্বেষী মনোভাব।স্বাধীনতার পরে তিনি বিন্দুমাত্র দেশের কথা ভাবেননি। দেশের মানুষ কষ্টে,অনাহারে,অভুক্ত থাকলেও নিজের সুখ,স্বাচ্ছন্দ,আনন্দ,ফুর্তিতে ছিলেন অবিচল।দিন রাত বিভিন্ন পার্টিতে যোগদান করে মহাভুরিভোজ থেকে বিরত থাকতেন না, তেমনি দেশের রাজকোষ শূন্য করে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়াতেন এমন প্রমাণ বহুবার পাওয়া যায় বিভিন্ন তথ্য থেকে।এমন মহান দেশপ্রেমিকের চরম ভুলে ভারতবর্ষের ফুটবল বিশ্বের গণ্ডি স্পর্শ করতে পারল না আজও। কারণ শুরুতেই ফুটবলের মাজা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন জহরলাল নেহেরুর কংগ্রেস সরকার।স্বাধীন ভারতে ১৯৪৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে ভারতীয় ফুটবল দল খেলার অনুমতি পায়।কিন্তু এতই দুর্ভাগ্য যে স্বাধীন ভারতের ফুটবল টিমের কাছে জুতো কেনার পয়সা ছিল না।কিছু খেলোয়াড় মোজা এবং বাকিরা খালি পায়ে খেলেছিল।ভারতের প্রথম ম্যাচ ফ্রান্সের সাথে ছিল। কিন্তু ফ্রান্সের ফুটবলাররা কেউ খালি পায়ে খেলেননি। ভারতীয় ফুটবল টিমের প্রদর্শনী খুশি হয়ে দর্শকরা স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়েছিলেন।
এরপরেও মহাসুযোগ এসেছিল ব্রাজিল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপে। ভারত ওয়ার্ল্ড কাপ বিশ্বকাপ খেলা তে কোয়ালিফাই ও করেছিল।কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয় টিমকে ব্রাজিলে পাঠাতে অনুমতি দেয়নি ভারত সরকার। সরকার পক্ষ থেকে দেশের মানুষকে বলা হয়েছিল ফিফা খালি পায়ে খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে।আর ফিফাকে বলা হয়েছিল ভারত বর্ষ গরিব দেশ তাই ব্রাজিল পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাদের কাছে নেই।কিন্তু ফিফা জানিয়েছিল যে তারা ভারতের মতো প্রতিভাবান টিম এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করুক। তাই তারা ভারতীয় টিমের আসা যাওয়া থাকা খাওয়া সব খরচ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। তবুও ভারত সরকার ভারতীয় ফুটবল দলকে খেলতে পাঠায়নি।তখন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সরকারের অধীনে ছিল।বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেও অংশগ্রহণ করতে না পেরে টিমের মনোবল একেবারে ভেঙে যায় এবং এরপর থেকে আজ পর্যন্ত আর ভারতবর্ষের বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। আগামী ভবিষ্যতের সেই সুযোগ পাবে কিনা তাও কারো জানা নেই। তবে এ প্রসঙ্গে আরো জেনে রাখা ভালো,যে সরকারের কাছে ভারতীয় ফুটবল দলের জন্য জুতো কেনার পাশে ছিল না সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী দৈনিক পোশাক প্যারিস থেকে ড্রাই ক্লিন হয়ে আসতো।নেহেরুজির প্রেমিকা এড বিনাকে লেখা চিঠি এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে করে যেত। বুঝতে পারছেন,যিনি ভারতবর্ষের ফুটবলের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন তার নামে শিশু দিবস পালন করা হয়। আরো আশ্চর্যের বিষয় আজ ভারতের সাতটা ফুটবল স্টেডিয়াম এর মধ্যে তিনটি নাম জহরলাল নেহেরু নামে। আর একটি নেহেরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর নামে।সেই সময়ে ভারতীয় টিমের ক্যাপ্টেন শৈলেন্দ্রনাথ মান্না বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন ক্যাপ্টেন এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিছু বছর পর তিনি ভারতীয় ফুটবলের সাথে হওয়া এই প্রতারণার কথা জানিয়েছিলেন।এই হলো ভারত বর্ষের ফুটবলের ইতিহাস।এসব নিয়ে আজ আমরা কেউ মাতামাতি করি না,বা ভাবার সময় কারো নেই।তবে দেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও, পেলে-মারাদোনার সৌজন্যে ইউরোপীয় গতিময় ফুটবলের তুলনায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রেমে বেশি পড়েছে বাঙালি। আর বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সেই প্রেমের-ই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সারা বাংলাজুড়ে।দেশ বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া তো দূরের কথা, সুযোগের কথাও ভাবতে পারে না, সে দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে এত উন্মাদনা ভাবতে খুব অবাক লাগে তাই না।
বিশ্বকাপ খেলাও যথেষ্ট উপভোগ করেছে বিশ্বের মানুষ।কিন্তু একটা ব্যাপার জানার পর থেকে মনে এটা কাঁটা বিঁধে আছে।যার যন্ত্রণা বার বার বিশ্বকাপের মতো রঙিন উৎসবের রঙ ধূসর করে দিচ্ছে।বিশ্বাস করুন,কাল বিশ্বকাপ ফাইনালের পর যে আতসবাজি ও আলোর রোসনাই দূরদর্শনের পর্দায় দেখাচ্ছিল, বার বার তার পেছনের অন্ধকারময় কালো দিকটাই আমার চোখে ফুটে উঠছিল।কাতার এক অর্থে ‘বিদেশি’দের দেশও বলা যেতে পারে। কারন এতদিন পর্যন্ত এখানকার বাসিন্দাদের বেশির ভাগই ছিলো বিদেশি শ্রমজীবী-কর্মজীবী।তাদের মধ্যে আবার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছেন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর হতভাগ্য জনগণ। যারা বহু বছর ধরে রুটিরুজির সন্ধানে কাতারে ছিল।বিশ্বকাপের অনুমতি পেয়ে কাতার, বহু ধরনের নতুন ভবন, স্টেডিয়াম, রাস্তা, বাসস্থান তৈরির কর্মসূচিতে নেমেছিল । স্বাভাবিকভাবে বিদেশি ফুটবলপ্রেমীদের থাকার ব্যবস্থা করতে কাতারকে হোটেল,সামর্থ্য বাড়াতে হয়েছে কয়েক গুণ। এ রকম সব নির্মাণযজ্ঞের ক্ষুধা মেটাতে,বহু বছর ধরেই আফ্রিকার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া থেকে নতুন করে বিপুল শ্রমিক গিয়েছেন।তাদের একাংশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের কিছুটা কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন আমাদের দেশের শ্রমজীবীরাও।কিন্তু সব চাইতে অবাক করার বিষয় এই রকম শ্রমজীবীদের আমাদের দেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী কোনো সংগঠন নেই,যেমনটি আছে ফুটবলের জন্য ফিফা। আর্জেন্টিনার ‘বিশ্বকাপ’ জেতা নিয়ে রাত ভোর উন্মাদনা হল,পার্টি চললে ও কাতার
ফুটবল মাঠ গুলোকে নতুন রূপ দিতে শ্রম বেচতে যাওয়া শ্রমিকদের কথা শোনার মানুষ কম।
শুধুমাত্র কাতারের গরমের কথা মাথায় রেখে বিশ্বকাপ হয়েছে শীতে, কারণ গ্রীষ্মে কাতারের গড় তাপমাত্রা হামেশাই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে।এক্ষেত্রে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই,যে পরিকাঠামো নির্মাণ তো গ্রীষ্মে কালে ও বন্ধ থাকেনি।যেখানে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়া সে ভারতের মানুষের অবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাঁসফাঁস করে,সেখানে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উপযুক্ত সুরক্ষার অভাব শ্রমিকদের কতটা বিপর্যস্ত করেছে তা নিশ্চই অনুভব করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কাতার সরকার শ্রমিকদের জন্য ঠান্ডা মেশিনের ব্যবস্থা করেনি সেই বিষয় সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত।তার উপর, সারা বিশ্ব থেকে আসা সমর্থক, সাংবাদিক, কর্মকর্তারা যে সব রাস্তা দিয়ে স্টেডিয়ামে যাবেন, সেই সব এলাকায় বসবাসকারী শ্রমিকদের দু’ঘণ্টার নোটিসে জায়গা খালি করে দেওয়ার ফতোয়াও জারি করেছিলো কাতার সরকার।
করোনাকালে আমাদের দেশেও পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যু মিছিল নিয়ে অনেক কথা তুমুল উত্তেজনাও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু কাতারে সাতটি স্টেডিয়াম-সহ নানা নির্মাণ কাজে ২০১০-২০ সময়কালে নাকি অন্তত সাড়ে ছ’হাজার অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে,যা বিভিন্ন দৈনিক তথ্যসূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২৭১১ জন, নেপালের ১৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১০১৮ জন, শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জন। পাকিস্তান দূতাবাস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানি শ্রমিক মারা গিয়েছেন অন্তত ৮২৪ জন। ফিলিপিন্স বা কেনিয়ার মতো দেশ থেকে আসা শ্রমিকের তথ্য মেলেনি, অতএব মোট মৃতের সংখ্যা আরও বেশি, দাবি উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৫,০২১।নিজেদের জীবনের বিনিময়ে এক শ্রেণীর মানুষ সমগ্র বিশ্বের মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেল। তাদের কষ্টগুলো ঢাকা পড়ে গেল প্রদীপের আলোর তলায়।
একজন রাষ্ট্র বাদী জনগণের কাছে নিজের দেশের পতাকা জীবনের থেকেও মূল্যবান হওয়া উচিত।কারণ আমাদের দেশের পতাকার ইতিহাসটা মন দিয়ে অনুধাবন করা দরকার।এই এই পতাকা ভারতের মাটিতে স্বাধীন ভাবে তুলতে গিয়ে বহু জনগন আত্ম বলিদান দিয়েছেন।অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছেন।বহু বিপ্লবী নিজেদের ধন-সম্পদ,সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে দেশ ছাড়া হয়েছেন। আজও দেশের পতাকা র আত্ম মর্যাদা রক্ষা করতে দেশের সেবক রা ঝড়,জল,তুষার,মরু তে অতন্দ্র পাহারায় নিজেদের জীবন কে উৎসর্গ করার মধ্যে দিয়ে গর্ব বোধ করেন সেনা জোওয়ানরা।তাই আজও মহান ব্যাক্তিদের মৃত্যুর পর তার দেহ কে এই পতাকা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়।যা ভারত বাসী হিসাবে অত্যন্ত সন্মান জনক ও গর্বের।ব্রাজিল,আর্জেন্টিনার জনগন আপনার পতাকা নিয়ে হাতে ছুঁয়ে ও দেখবে না। খেলা দেখুন,উপভোগ করুন,কিন্তু নিজের পতাকার মান সন্মান বাঁচানোর দায়িত্ব একজন সু_নাগরিক হিসাবে প্রত্যেক ভারতীয়র।






















