May 15, 2021, 5:17 am

যে কারণে কথিত ‘আত্মহত্যার’ মিডিয়া কভারেজ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়

কথিত এক ‘আত্মহত্যার’ ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে, আর সেই সঙ্গে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে এই ঘটনার মিডিয়া কভারেজ নিয়ে। এই ঘটনার খবর কিছু পত্রিকায় ছাপা হলেও কিছু পত্রিকা একেবারেই এড়িয়ে গেছে।গত সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের এক ফ্ল্যাটে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় এক কলেজ পড়ুয়া তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় নিহতের বোন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে আসামী করা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এক শিল্প গোষ্ঠী বসুন্ধরার ম্যানেজিং ডিরেক্টর সায়েম সোবহান আনভীরকে। -বিবিসি বাংলা
ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর হতে এ পর্যন্ত যেভাবে গণমাধ্যমে এই ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে, কিংবা যেভাবে পুরো ঘটনাটির খবর কোন কোন গণমাধ্যমে একেবারে চেপে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন সমালোচনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, প্রত্যেকটি মিডিয়া তাদের ”বেস্ট জাজমেন্ট” অনুসারেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেটা সবার পছন্দ নাও হতে পারে। বসুন্ধরা গ্রুপ শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীই নয়, তারা একই সঙ্গে বাংলাদেশে কয়েকটি সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল, টিভি চ্যানেল এবং এফএম রেডিও স্টেশনের মালিক। বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বসুন্ধরা গ্রুপই সবচেয়ে বড় বলে মনে করা হয়। এর পাশাপাশি এই গ্রুপের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তৃত বিদ্যুৎ, সিমেন্ট, শিপিং, এয়ারলাইন্স, ফুড এ্যান্ড বেভারেজ- এরকম নানা ক্ষেত্রে। বসুন্ধরার মালিকানাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ এবং দ্য সান- এই তিনটি দৈনিক পত্রিকা। অনলাইন পোর্টাল বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরও তাদের মালিকানাধীন। এছাড়া এই গ্রুপের রয়েছে নিউজ টোয়েন্টিফোর নামের টিভি চ্যানেল এবং ক্যাপিটাল এফএম নামের রেডিও স্টেশন। এরকম একটি বিশাল এবং প্রভাবশালী শিল্প গোষ্ঠীর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের বিরুদ্ধে এক তরুণীর সঙ্গে কথিত সম্পর্কের কারণে তাকে ”আত্মহত্যার প্ররোচনা” দেয়ার অভিযোগটি গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে একেবারেই আসেনি, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই এই ঘটনার মিডিয়া কভারেজ প্রভাবিত হয়েছে কিনা সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
খবরটি কেন প্রকাশ করা হয়নি : সোশ্যাল মিডিয়ায় এটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সাংবাদিকদের যেমন তীব্র সমালোচনা করেছেন অনেকে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্য থেকেও অনেকে এসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সাংবাদিক আনিস আলমগীর এ নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, “আজ যেসব পত্রিকায়, এবং গতকাল পর্যন্ত যেসব অনলাইনে বা টেলিভিশনে বসুন্ধরার এমডি’কে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত-প্রচারিত হয়নি, আপনি নিশ্চিত ধরে নেন, তারা মিডিয়ার মালিক হয়েছেন আপনাকে সংবাদ সরবরাহ করার জন্য নয়- নিজেদের অবৈধ ব্যবসা, নিজেদের এবং পরিবারের অপরাধ, অবৈধ কর্মকাণ্ড ঢাকার জন্য। অন্যের মিডিয়া তাকে কামড়ে দিলে পাল্টা কামড়ে দেয়ার জন্য।”
ফেসবুকে আরেকটি পোস্টে সারওয়ার ই আলম নামে একজন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে লিখেছেন, “দেশে এতবড় একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গেল, অথচ আপনাদের কাগজে, পোর্টালে বা চ্যানেলে এ নিয়ে একটা খবরও চোখে পড়লো না, বিষয়টি আমার মতো পাঠককে যারপরনাই স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করেছে। আপনারা কি নিজেদের প্রশ্ন করেছেন, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দাবিতে আপনারা আবার কলম ধরবেন কীভাবে? সুশাসন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের দাবিতে বড় বড় সম্পাদকীয় লিখতে আপনাদের কি এতটুকু লজ্জা করবে না?”
কেন অভিযুক্তের নাম নেই: বাংলাদেশের প্রথম সারির কোন কোন সংবাদপত্রে এই খবরটি প্রথম পাতায় ছাপা হলেও কোন কোন পত্রিকায় খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে বেশ গুরুত্বহীনভাবে ভেতরের পাতায়। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন না হওয়া সত্ত্বেও এবং সরকারের দিক থেকে এই খবর প্রকাশের ব্যাপারে কোন ধরনের বিধিনিষেধ বা চাপ না থাকার পরও কেন এমনটি হলো- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে খবরটি প্রকাশ করলেও সেখানে মামলার আসামী সায়েম সোবহান আনভীরের নাম উল্লেখ করা ছিল না, ছবিও প্রকাশ করেনি অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে এটি নিয়েও।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শরিফুল হাসান এ বিষয়ে তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “মামলায় কারও নাম আসার মানে এই নয় যে তিনি অপরাধী। পুলিশ তদন্ত করবে, বিচার হবে। সাংবাদিকরা লিখবে, অনুসন্ধান করবে। কিন্তু দেখেন, এই ঘটনায় আসামির নাম শুনেই আটক হয়ে গেছে স্বাধীন সাংবাদিকতা। অথচ রাষ্ট্র-পুলিশ কেউ বলেনি এই অপরাধীর নাম লেখা যাবে না।”
মেয়েটিকে কেন ভিলেন বানানোর চেষ্টা: বাংলাদেশে মেয়েরা কোন অপরাধের শিকার হওয়ার পর এজন্যে তাকেই দোষারোপ করার যে প্রবণতা (ভিক্টিম ব্লেমিং), এক্ষেত্রেও কোন কোন গণমাধ্যমে সেই সেটি দেখা গেছে বলে সমালোচনা করেছেন অনেকে। ফাতিমা তাহসিন ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, “বাচ্চা একটা মেয়ে, তাকেও মরার পর ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতেছে গালি দিয়ে। ভেতরের কাহিনি আমরা কতটুকু জানি? আসল কাহিনি প্রকাশ করা দূরে থাক, অভিযুক্তের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেনি মেইনস্ট্রিম পত্রিকাগুলো।” সুইডেন প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক এবং লেখিকা সুপ্রীতি ধর লিখেছেন, “মেয়েটি লোভী না নির্লোভ, সেটা আমি, আপনি বলার কে? মেয়েটি রক্ষিতা না প্রেমিকা, সেটাও আমরা বলার কেউ নই। একটি মেয়ে মারা গেছে, মেয়েটিকে খুন করা হয়েছে, তা নিয়ে কথা বলুন।” ঘটনার পর কিছু কিছু গণমাধ্যমে মৃত তরুণীর সঙ্গে সায়েম সোবহান আনভীরের একসঙ্গে তোলা ছবি যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে সেটি নিয়েও। অনেকে মেয়েটির ছবি প্রকাশ করলেও সায়েম সোবহান আনভীরের ছবি প্রকাশ করেনি, কিংবা তার মুখের চেহারা ঝাপসা করে দিয়েছে।
বসুন্ধরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী এক শিল্পগোষ্ঠী: চ্যানেল আই এ নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে ফেসবুকে এক পোস্টে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ এজন্যে দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, টেকনিক্যাল ভুলের কারণেই ভিকটিমের পরিবর্তে অভিযুক্তের ছবি ঝাপসা করে প্রচার হয়েছিল। চ্যানেল আই’র বার্তা বিভাগের এই বিবৃতিতে বলা হয়, “ভুলটি অসাবধানতার কারণে হলেও তা চ্যানেল আই’র নীতি-নিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থী। এজন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।, আমাদের সংবাদে অভিযুক্তের নাম এবং পরিচয়ের বিস্তারিত ছিল। সুতরাং অভিযুক্তের ছবি ব্লার করার কোন কারণ বা ইচ্ছা ছিল না, অসাবধানতার কারণে ভিকটিমের বদলে অভিযুক্তের ছবি ব্লার হয়ে গেছে। আমরা আমাদের এ ভুল স্বীকার করছি।”
সাংবাদিকদের দায়ী করা কতটা যুক্তিযুক্ত: তবে এই ঘটনার কভারেজকে ঘিরে যেভাবে সাংবাদিকরাই এখন আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন কেউ কেউ। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন স্টাডিজের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক মোঃ সামসুল ইসলাম বলছেন, রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি- এসবের আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ না করে ব্যক্তি সাংবাদিককে দায়ী করার প্রবণতা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “সাংবাদিকরা চাকরি করেন। কোন ঘটনার মিডিয়া কভারেজের ব্যাপারে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তার ভূমিকা নিতান্তই গৌণ। বসুন্ধরার মিডিয়া সাম্রাজ্যকে নাড়া দেয়ার ক্ষমতা এখন কোন মিডিয়ারই নেই। খামাখা সব ব্যাপারে সাংবাদিকদের গালি দিয়ে কে কি অর্জন করছেন তা বুঝতে পারছি না।”
অনেকটা একইভাবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সমালোচনার জবাবে কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলি সাগর লিখেছেন, “এই ঘটনায় প্রত্যেকটি মিডিয়া তাদের ‘বেস্ট জাজমেন্ট’ অনুসারেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্ত কারও পছন্দ হয়েছে, কারও পছন্দ হয়নি। এই পছন্দ-অপছন্দের খেলায় যারা মিডিয়াকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইছেন, কিংবা দেশে কোন সাংবাদিকতা নেই বলে মত দিচ্ছেন, আমি তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি।” তিনি লিখেছেন, বসুন্ধরার এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় সেসব নিয়ে সম্পাদক-সাংবাদিকদের আক্রমণ করাটা অনাকাঙ্ক্ষিত। তাঁর মতে, “এখনো বাংলাদেশে মিডিয়াই জনগণের শেষ ভরসাস্থল। মিডিয়া নিয়ে সমালোচনার আগে এই কথাগুলো যেন আমরা বিবেচনায় রাখি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ:
BengaliEnglish