June 22, 2021, 10:43 am

শাহেদ!

লেখক মোহাম্মদ রশীদুর রহমান।

(আগামীকাল ১১-ই জুন বাবার মৃত্যুবার্ষিকী-
বাবার লেখা “শাহেদ”নামে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের রচনাটির সংক্ষিপ্ত রূপ পূর্বে শেয়ার করেছিলাম, পূর্ণাঙ্গ রচনাটি আজ শেয়ার করলাম) রাশিদা-য়ে আশরার।

শাহেদ বসে আছে। অক্লান্ত ভারে, সুদূর দিগন্তের দিকে শুধু চেয়ে থাকে। কি যেন পাবার চেষ্টা করে। মনে হয় ওর দ’কাখে পাওয়া না পাওয়ার বেদনার ছাপ! ও বাস্তবতার নির্মম কষ্টঘাতে নিজেকে নিঃশেষ করতে চায়। ওর বেঁচে থাকার সার্থকতা যেন এই পৃথিবীর কোন জায়গায় খুঁজে পায়না। শাহেদের মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে এই কি সেই দেশ, যে দেশের জন্য ৩০ লক্ষ মুক্তি যোদ্ধা প্রাণ দিয়েছে ২ লক্ষ মা-বোন সতীত্ব হারিয়েছে! যে দেশে ওর প্রেমিকা দেশীয় আল বদর আর গোলাম আযমের জারজ সন্তান কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছে, ওর বিধ্বস্ত রক্তাক্ত বসনা দিয়ে সৃষ্টি করেছে রক্তিম পতাকা। এগুলোর কি আজ কোন মূল্য নেই? স্বাধীনতার ২২ বছর পর শাহেদ আজ পাওয়া না পাওয়ার হিসাব করে। বড় কষ্ট হয় ওর,
দেখে না পাওয়ার বেদনা টাই বেশি ভারী। আজ রক্তিম পতাকা কে অবমাননা করা হয়, স্বাধীনতা বিরোধীরা সংসদে বসে শিখা অনির্বাণ সম্পর্কে কটুক্তি করে।
লেবাসধারী রা ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত,আযমের সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা সমগ্র দেশে রডা বাটা হাত কাটা গলা
কাটা নীতি তে ব্যস্ত। সংবিধান থেকে নিরপেক্ষতা
কাটা হয়েছে। ৭৫-এর পর থেকে’ ৭১- দালালদের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধর্মব্যবসায়ী হিন্দু, মুসলমান
হানাহানিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মত্ত। সাম্প্রদায়িকতা
রক্ত বিষবাষ্প কোমল মেহনতী মানুষের মাঝে ছড়ানো হয়েছে। এই জন্যই কি শাহেদ যুদ্ধ করেছে? এইজন্যই কি ওর নীলা প্রাণ দিয়েছেন, শাহেদ জানে গুলোর উত্তর সে কখনো কোন দিন পাবে না। পেতে পারে না।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আসছে। সূর্যটা অনেক আগেই নিজের অস্তিত্ব হারিয়েছে। কেমন যেন সব নিষ্ক্রিয় কালো অন্ধকার। শাহেদ আর বসতে পারে না। বাড়ির মুখপানে হাটে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায়। রাতে শাহেদের চোখে ঘুম আসে না। কি যেন সব ওকে তাড়া করে ফিরে। কোন কিছুতে মন বসেনা কোথাও যেন একান্ত শান্তি খুঁজে পায় না। সব কেমন যেন ওলটপালট লাগে।
শাহেদ এসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ে। রাত বোধহয় দ্বিপ্রহর হবে। আকস্মিক ভাবেই শাহেদের ঘুম ভেঙে যায়।কি যেন ও দেখেছে।
কি যেন দেখার চেষ্টা করছে। ভাবছে কি জন্য ওর ঘুম ছুটে গেল? কিন্তু কিছুতেই সদোত্তর খুঁজে পেল না। রাত্রে আকাশে জ্যোৎস্না উঠেছে। খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার ওর এই নিঃসঙ্গ একা জীবনে নানান কথা মনে পড়ে। মনে করে। বৃদ্ধের পর্যায়ে উপনীত। সেই ২২-বছর আগেকার শক্তি সামর্থ্য নেই । মনটা তাই খুবই স্পর্শ কাতর হয়ে গেছে। অল্প কিছুতেই ভেঙে পড়ে। কিন্তু শাহেদ জানে ওরা যুদ্ধ করেছিল। একটা লক্ষ্য কে কেন্দ্র করে। সোনার বাংলায়
যেখানে বাঙালিরা উঁচু-নিচু ভেদাভেদ বাদ দিয়ে ঐক্য- বদ্ধ ভাবে জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা পূর্ণ মর্যাদা পাবে। সেখানে দারিদ্রতা দূর হতে হবে “সবার উপরে মানুষ সত্য”এই নীতিতে সোনার বাংলা চলবে।

কিন্তু সত্যিই কি যোদ্ধারা সোনার বাংলা পেয়েছে? এরা বাংলার মূল্যবোধ সম্পর্কে জানে না। এরা জাতীর জনক কে চেনে না। জানেনা বাঙালির দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ইতিহাস। শাহেদের রক্ত আর যৌবনের গড়া তাড়া নেই। তরুণের রক্তের মতো টগবগিয়ে ওঠেনা ও কোন কিছুর প্রতিবাদ করতে পারে না। ওর পঙ্গুত্বের অসহায়ত্ব সব বৃথা বলে মনে হয়, এসব সম্বন্ধে ভাবলে শাহেদের বোধ বিফলে যায়। কি যেন অদৃশ্য পাষাণ হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে, শাহেদ খোলা জানালা দিয়ে ফুটফুটে জোছনায় আঁকা বাঁকা গায়ের মেঠ পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি যেন সব অব্যক্ত, অশান্ত জ্বালা তার সমস্ত দেহ মনে জড়িয়ে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ:
BengaliEnglish