অনলাইন ডেস্ক।।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম জনপ্রিয় ও লাভজনক রুট ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা। যাত্রীদের ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে ট্রেনের সংখ্যা কম থাকায় এই রুটের টিকিট পাওয়া অনেকটা সোনার হরিণের মতো। চাহিদার কারণে অনেক যাত্রী অতিরিক্ত অর্থ দিয়েও টিকিট সংগ্রহ করছেন।
এ পরিস্থিতিতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ আরও বাড়াতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চলতি মাসেই ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের আন্তঃনগর ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ (৭২১/৭২২) ট্রেনের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ দিনের মধ্যেই ট্রেনটি কক্সবাজার রুটে চলাচল শুরু করতে পারে।
যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটে নতুন ট্রেন চালুর বিষয়টি কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় ছিল। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ ও কোচ সংকট থাকায় নতুন ট্রেন চালু করা সম্ভব হচ্ছিল না।
পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর সময়সূচি পর্যালোচনা করে কোনো ট্রেনের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানো যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। এতে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’-এর সময়সূচি কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
রেলওয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এটি হবে পঞ্চম ট্রেন। ৪৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে মহানগর এক্সপ্রেস যুক্ত হলে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার অতিরিক্ত যাত্রীর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে। তবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রচলিত আন্তঃনগর ট্রেনের ভাড়াই বহাল থাকবে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশে ট্রেনটি বিরতিহীন হওয়ায় ওই অংশের ভাড়া কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের মতো নির্ধারণ করা হবে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালুর পর থেকেই এই রুটে যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ দিয়ে প্রথমবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রথম দিনই ১ হাজার ১০ জন যাত্রী ঢাকা থেকে কক্সবাজার যান।
এরপর ট্রেনটির আসন প্রায় নিয়মিতই পূর্ণ থাকায় মাত্র ৪০ দিনের ব্যবধানে ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ নামে আরও একটি ট্রেন চালু করা হয়। বর্তমানে ঢাকা থেকে দুটি এবং চট্টগ্রাম থেকে দুটি ট্রেন কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের একটি সূত্র জানায়, এই দুটি ট্রেনে বছরে গড়ে ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৬০ দিনই শতভাগ যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ে। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ দিন ট্রেন দুটি পূর্ণ আসনে চলাচল করে। ফলে ঢাকা-কক্সবাজার রুটটি বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম লাভজনক রুটে পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের আয় গত এপ্রিল মাসে কক্সবাজার এক্সপ্রেস (৮১৩ ও ৮১৪) থেকে রেলওয়ের আয় হয়েছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। মে মাসে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, এপ্রিল মাসে পর্যটক এক্সপ্রেস (৮১৫ ও ৮১৬) থেকে আয় হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং মে মাসে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এ কারণে কক্সবাজার রুটে আরও ট্রেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, রেলের কানেক্টিভিটি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে কক্সবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রটি আরও জানায়, এই দুটি ট্রেনে টিকিটের চাহিদা এমন যে, বছরে গড়ে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬০ দিনই (৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ) ১০০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ে ট্রেন দুটি। এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে লাভজনক রুট। তাই এই রুটে আরও ট্রেন বাড়ানোর চেষ্টা করছে রেলওয়ে।
মহানগর এক্সপ্রেসের সময়সূচি ও ভাড়া কেমন হবে? মহানগর এক্সপ্রেসই যে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পঞ্চম ট্রেন হতে যাচ্ছে, বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন। যাত্রীবাহী এই আন্তঃনগর ট্রেনটি গত ৪০ বছর ধরে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলাচল করছে। দুই বছর আগে ট্রেনটির রেকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা আধুনিক ব্রেক সিস্টেমের নতুন কোচ যুক্ত করা হয়েছে।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে মহানগর এক্সপ্রেস (৭২২) ঢাকা থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পথে ১২টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে রাত সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, সেখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে ট্রেনটি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। এরপর টানা তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে পৌঁছাবে।
সেখানে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিরতির পর মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কক্সবাজার স্টেশন থেকে ছেড়ে আসবে। তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে। সেখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে আগের মতোই দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। পথে ১২টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাবে। এই সময়টা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। চলতি মাসের মধ্যেই ট্রেনটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিস্তারিত সময়সূচি ও আনুষঙ্গিক বিষয় চূড়ান্ত করতে দ্রুতই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে। — মো. সুবক্তগীন, মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল)
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনটি ৩২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গেলে আরও ১৫২ কিলোমিটার পথ যুক্ত হবে। ফলে মোট দূরত্ব দাঁড়াবে ৪৭২ কিলোমিটার। তবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভাড়া সাধারণ আন্তঃনগর ট্রেনের মতোই থাকবে, কারণ ট্রেনটি বিরতিহীন নয়। কিন্তু চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অংশে ট্রেনটি বিরতিহীনভাবে চলবে। ফলে ওই অংশের ভাড়া বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ এর মতোই হবে।
মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের মোট আসনসংখ্যা রাতে ৭০৬টি এবং দিনে ৭৩৬টি। ট্রেনটিতে এসি বার্থ, স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) এবং শোভন চেয়ার শ্রেণির আসন রয়েছে। অর্থাৎ এই ট্রেনে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে।
কবে কক্সবাজার যাবে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’? বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, আমরা এই মাসের মধ্যে চালু করবো। বিষয়টি নিয়ে আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে হবে। আনুমানিক সময়টা এখনই বলতে পারছি না।
তবে ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ কক্সবাজার পর্যন্ত এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহে চালানো হবে বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। তিনি বলেন, এই মাসের মধ্যে কার্যকর হয়ে যাবে। বলতে পারেন, এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি রেলের কানেক্টিভিটি বাড়াতে। আমাদের লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও পর্যটন স্পট হিসেবে কক্সবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের আইকনিক স্টেশনের ব্যবস্থাপনা বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালনার দায়িত্ব দায়িত্ব দিতে চাচ্ছি।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী বলেন, যদি রেলের সক্ষমতা থাকতো, তাহলে কক্সবাজার রুটে ট্রেন দ্বিগুণ করতাম। ভবিষ্যতে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ এলে কক্সবাজার রুটে ট্রেন বাড়ানো আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যেই থাকবে।
সম্পাদক ওপ্রকাশক: মো: আব্দুর রহমান। +88 01954-105871
বার্তা-সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম হোসেন। +8801888105799
E-mail : padmanews1@gmail.com