
মাঠপর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনগত, প্রশাসনিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে থাকেন জেলা প্রশাসকরা। তাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা সরকারের কাছে পেশাগত সুরক্ষা চান। কোনো সরকারের আমলে নির্বাচনের পর, পরবর্তীতে অন্য সরকারের আমলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা। এ থেকে তারা পরিত্রাণ চান। আজ রবিবার শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। এ সম্মেলন সামনে রেখে এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন অনেক জেলা প্রশাসক।
রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কয়েকজন জেলা প্রশাসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, বিগত সময়ে দেখা গেছে মাঠ প্রশাসনে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ের সরকারের আমলে কোণঠাসা হয়ে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর, বদলি, মামলা মোকদ্দমায় জড়ানো- এটি দীর্ঘদিনের চর্চায় পরিণত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় আদেশ-নির্দেশ পালন করছেন মাত্র, যা তাদের চাকরিরই অংশ। তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা কেন রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে চাকরিজীবনে বিপর্যস্ত হবেন? সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিতে প্রভাব পড়ে- এমন অনভিপ্রেত ঘটনা থেকে ভবিষ্যতে আমাদের পেশাগত সুরক্ষা প্রয়োজন, বলেছেন তারা।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং ২০১৩ সালে বাতিল করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এরপর থেকে ক্ষমতাসীনদের করা নীলনকশায় এবং প্রয়োজনীয় সব রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদেরই অধীনে অনুষ্ঠিত হয় দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। প্রতিটি নির্বাচনেই চলে ভয়াবহ কারচুপি। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করলেও এতে কর্ণপাত করেনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নীলনকশার একপেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিজেরাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এ নীলনকশা বাস্তবায়নের অন্যতম কুশীলব ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেজুড়বৃত্তি করা ডিসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। মাঠ প্রশাসনের এ কর্মকর্তাদের সঙ্গে চলে মাঠ পুলিশের যোগসাজশও। এসব অপকর্ম বাস্তবায়নে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তরফেও দেওয়া হয় নির্দেশনা। হাসিনার পতনের পর পাল্টে গেছে প্রেক্ষাপট। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে নানা অপকৌশলে ক্ষমতাসীনদের গদি টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের যারা কুশীলব ছিলেন, এরই মধ্যে তাদের একটি তালিকা চূড়ান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে।
এদিকে আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজ কার্যালয়ের শাপলা হলে ডিসি সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। এতে ১২টি আলোচ্য ইস্যুতে ৩৫৪টি প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। গতকাল বিকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫’ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব শেখ আব্দুর রশীদ। এ সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে ডিসিদের প্রস্তাবনায় জনপ্রতিনিধির আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, তারা প্রস্তাব দিতেই পারেন। মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকালে সরকারের অনেক কর্মকর্তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এখনও মবজাস্টিস ঠেকাতে অনেক মাঠ কর্মকর্তা বিপাকে পড়েন। এ জন্য তারা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের জন্য র্যাপিড রেন্সপন্স টিম দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন। এ ছাড়া সার্কিট হাউস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও ডিসির বাসভবনকে কেপিআই (কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন) ঘোষণা করার কথা বলেছেন। এ ছাড়া একজন ডিসি পুলিশকে প্রাণঘাতী ও ছররা গুলি ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাবও দিয়েছেন। কারণ, জনবিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও ছররা গুলি মানবদেহে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে বলে প্রতীয়মান হয়েছে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।
সম্মেলনে আলোচ্য ১২টি বিষয় : সম্মেলনে আলোচ্য ১২টি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- ভূমি ব্যবস্থাপনা; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম জোরদারকরণ; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম; স্থানীয় পর্যায়ে কর্ম-সৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচি বাস্তবায়ন; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ও ই-গভর্নেন্স; শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ; স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ; পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ; ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়।
গত সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৪৬ শতাংশ : মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ জানান, গত বছর জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৪৬ শতাংশ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর সরকারের দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিভিন্ন স্থাপনার নাম বিশেষ কোনো ব্যক্তির নামে করার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে মোট কার্য-অধিবেশন হবে ৩০টি এবং চারটি হবে বিশেষ অধিবেশন।
কেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ডিসিদের সৌজন্য সাক্ষাৎ রাখা হয়নি- এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, ওনার (রাষ্ট্রপতি) শিডিউলের সঙ্গে মেলেনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট নিয়ে আপনারা ডিসিদের কী বার্তা দেবেন? জানতে চাইলে শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি শুরুই হবে একটি ভিডিও প্রদর্শনীর মাধ্যমে। এতে ওই আন্দোলন কীভাবে হয়েছিল, কীভাবে আন্দোলনের ফল লাভ হলো, সে সবের বিবরণ থাকবে। আমরা সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে এটা দেখতে চাইছি। তিনি জানান, গত বছর ডিসি সম্মেলনের বাজেট ছিল ২ কোটি টাকারও বেশি। এবার ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।-আমাদের সময়
সম্পাদক ওপ্রকাশক: মো: আব্দুর রহমান। +88 01954-105871
বার্তা-সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম হোসেন। +8801888105799
E-mail : padmanews1@gmail.com