আর মাত্র ১১ দিন পরে পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের কাঙ্ক্ষিত রঙিন জীবন শুরু

অনলাইন ডেস্ক।
আর মাত্র ১১ দিন পরই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন পদ্মা সেতু। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সেতু উদ্বোধনের দিনক্ষণ গণনাসহ উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। তবে পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের মানুষ রঙিন স্বপ্ন বুনন শুরু করেছে। সেতু ঘিরে দুই পাড়ের মানুষ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নত জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। যার কারণে দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হবে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে বাড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। পদ্মা সেতু সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এটি এখন মর্যাদার সেতু। সেতুটি নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছে।
নানা মহলের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অদম্য সাহসীকতায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। পদ্মা সেতু একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের স্তরটিতে একটি একক রেলপথ।
খরস্রোতা পদ্মা নদীতে নির্মিত হয়েছে পদ্মা সেতু। পানি প্রবাহের বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরই এর অবস্থান। মাটির ১২০ থেকে ১২৭ মিটার গভীরে গিয়ে পাইল বসানো হয়েছে এই সেতুতে। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতু তৈরিতে এত গভীরে গিয়ে পাইল বসাতে হয়নি। যা পৃথিবীতে একটি অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
সেতু বিভাগ সূত্রমতে, পদ্মা সেতুর কারণে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পেয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠতে শুরু করেছে শিল্প-কারখানা, স্কুল-কলেজ, পর্যটন কেন্দ্র। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের প্রিয় ভ্রমণ ও অবকাশকেন্দ্র হয়ে উঠছে পদ্মার পাড়। সেতুর অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পর থেকেই পর্যটকদের পথচারণা বাড়ছে।
ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত এলাকা পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে মংলা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য অনেকগুণ বেড়ে যাবে। ফরিদপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মংলা, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও মুন্সীগঞ্জে নতুন শিল্পায়ন শুরু হয়েছে।
ইতোমধ্যে সড়কপথে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ৩৮টি রুটে সরাসরি বাস যোগাযোগ শুরু হবে, চলবে বিআরটিসি বাসও। দেশের বড় বড় ব্যসায়ী প্রতিষ্ঠানসহ অনেক নতুন উদ্যোক্তা শিল্প-কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। সব মিলিয়ে পদ্মার তীর ঘেঁষে হাতছানি দিচ্ছে নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন শহরের প্রতিচ্ছবি।
ইতোমধ্যে জাজিরা প্রান্তে ক্যান্টনমেন্ট এবং স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট, হোটেল গড়ার কাজ হাতে নিয়েছেন। পদ্মার পাড়ে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের একটি অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করার হচ্ছে ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী’। যার মাধ্যমে দুই জেলার কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন রকম শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কয়েকগুণ বেড়ে গেছে আশপাশের জমির দাম।
কলকাতা-আগরতলা রেল যোগাযোগ আরও সহজ হবে। সেতুর উভয় পাশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত করতে বিসিক শিল্পনগরীগুলো চালু ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমপ্রসারণসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের সহায়ক নীতি গ্রহণ, মাশুল আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রবাহে ফাইভার অপটিক ক্যাবল স্থাপন, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় সেতুর উভয় পাশে উন্নয়নের ব্যবস্থা, পৃথক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, নদীর উভয় পাশে ইকোপার্ক স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদুপর ও রাজবাড়ীতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বাসা-বাড়িতে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামেই দৃষ্টিনন্দন বাড়িঘর করার চেষ্টা করছেন অনেকেই। যার কারণে পাল্টে যেতে শুরু করেছে গ্রামীণ জীবনমান। হাট-বাজারগুলোতে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির শোরুম গড়ে উঠছে। পোশাক কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে অনেকে। এতে রাজধানীর উপর বসতি চাপ অনেকটা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শরীয়তপুর, জাজিরা, মাদারীপুরের শিবচরসহ দুই জেলার যেকোনো প্রান্ত থেকে দূরত্ব ভেদে ৫০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় আসার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
মাওয়া শিমুলিয়ার হোটেল ব্যবসায়ী রোকন উদ্দিন জানান, সেতু উদ্বোধনের খবরে মাওয়ায় মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। ঢাকা থেকে সারাদিন এবং সন্ধ্যার পর শত শত লোক এখনো আসছেন, আমাদের বেচাকেনা অনেক ভালো হচ্ছে। আমাদের এখনো আসা অধিকাংশ কাস্টমার ঘুরতে আসেন, এরা যাত্রী নন।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোবারক আলী শিকদার বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের শরীয়তপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ। গোটা শরীয়তপুরজুড়ে উন্নয়নকাজ চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম গন্তব্য হবে শরীয়তপুর। যার কারণে মানুষের মাঝে আনন্দ বিরাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের জাজিরাসহ আশপাশে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদিত হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পেতেন না। এখন মুহূর্তের মধ্যে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো স্থানে নিয়ে যেতে পারবেন। যার কারণে অনেকেই এখন গ্রামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন।
নড়াইল বঙ্গবন্ধু হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাছুম জমাদ্দার বলেন, আমাদের ব্যবসায়িক কাজে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন ঢাকায় যেতে হয় দোকানের মালামাল কিনতে। ঢাকায় যাওয়া-আসা এবং মালামাল কিনে ফিরে আসতে কমপক্ষে দুদিন সময় ব্যয় করতে হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে আমরা সকালে ঢাকায় গিয়ে মালামাল কিনে নিয়ে বিকেলের মধ্যে এসে বেচাকেনা করতে পারব। এতে করে আমাদের সময় এবং খরচ কমবে। তাতে আমাদের লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
শরীয়তপুর প্রেস ক্লাব সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে জানান, পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের খবরে দক্ষিণাঞ্চলে আনন্দের জোয়ার বইছে। পরিবহন ব্যবসায়ী নতুন নতুন গাড়ি প্রস্তুত করছেন। ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠান করতে শুরু করেছেন। হোটেল রেস্তোরাঁ হচ্ছে, পর্যটকদের চাপ বাড়ছে। সব মিলিয়ে উন্নয়নের সব ধরনের ছোঁয়া এখন শরীয়তপুরসহ আশপাশে এলাকাজুড়ে।
নড়াইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাসানুজ্জামান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে নড়াইলের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে। জেলায় ইতোমধ্যে বিসিক শিল্পনগরী এবং অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রকল্প চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বড় কোম্পানিগুলোর নড়াইলে জমি ক্রয় করে মিল-কলকারখানা তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে করে আমাদের এ অঞ্চলের বেকার সমস্যার সমাধান হবে, ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিপাবে। দেশের অন্যতম স্থবন্দর বেনাপোল থেকেও আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে।
এখনই টোল আদায় অটোমেশন হচ্ছে না : পদ্মা সেতুর টোল আদায় ব্যবস্থাপনা শুরুতে অটোমেশন হচ্ছে না। প্রথমে ম্যানুয়ালি টোল আদায় চলবে। অটোমেশনের জন্য অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করতে হবে। অবশ্য ছয় মাস পর অটোমেশন হলেও সেটা হবে আংশিক।
গতকাল রোববার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে সেতু সচিব মঞ্জুর হোসেন এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘টোল আদায়ে ম্যানুয়াল ও অটোমেশন দুই পদ্ধতিই চলবে। প্রথমে একটি কাউন্টারে অটোমেশন হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যগুলোতে করা হবে। তবে আমরা শুরুতে অটোমেশনে যাচ্ছি না। টোল আদায়ের যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের ছয় মাস লাগবে। এরপর তারা একটি কাউন্টারে অটোমেশন চালু করবে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নগদ টাকা প্রদান এবং ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টোল প্রদান করা যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরদিন (২৬ জুন) টোল প্রদান করার মাধ্যমে যানবাহন সেতু পার হতে পারবে।’ সরকারের কাছ থেকে লোন নিয়ে সেতুর নির্মাণ খরচ করা হয়েছে উল্লেখ করে কাদের বলেন, ‘৩০ বছরে সেতু বিভাগ সরকারকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা প্রদান করবে। এছাড়া নদী শাসনসহ সেতুর মেনটেইন খরচ রয়েছে।
এসময় চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, এমএম কামাল, অসীম কুমার উকিল, বিপ্লব বড়ুয়া, ইকবাল হোসেন অপু, আনোয়ার হোসেন, শাহাবুদ্দিন ফরাজী, নাহিম রাজ্জাক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।





















