সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রই বেশি

অনলাইন ডেস্ক।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যাই বেশি। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে। যে কোনো ধরনের গোলযোগ এড়াতে এসব কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল বেশি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব কেন্দ্রে নজরদারিও বেশি থাকবে। সারাদেশের মধ্যে ঢাকাতেই (ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মহানগর মিলে) ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলায়। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করতে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট এলাকার অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ভোটের আগেই আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সারাদেশের ভোটকেন্দ্রগুলোকে লাল (অতি ঝুঁকিপূর্ণ), হলুদ (ঝুঁঁকিপূর্ণ) ও সবুজ (সাধারণ) তিন ভাগে ভাগ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা, থানা থেকে দূরত্ব, রাজনৈতিক দলের আধিপত্য, পাহাড়ি এলাকা, দুর্গম এলাকা এবং ও চরাঞ্চলের বিষয়টি মাথায় রেখে তিন ক্যাটাগরির ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ছাড়া যেসব এলাকায় ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা বেশি হচ্ছে, সেসব এলাকার কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র দখল করতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারেরও চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এখনও সহস্রাধিক লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র ভোটের আগে উদ্ধার না হলে তা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পুলিশের সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সব ধরনের রিসোর্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি বিডিআর এবং সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে হবে। এ ছাড়া এমনভাবে স্ট্রাইকিং ফোর্স রাখতে হবে, যাতে কোনো ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। ভোটের আগেই লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে লাল চিহ্নিত অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৮ হাজার ৭৪৬টি, হলুদ চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৫৯টি। এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৭ হাজার ৬৫৬টি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২৫ হাজার ১০৫টি। ঢাকা রেঞ্জের ১৬ জেলায় দুই ক্যাটাগরির ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মোট সংখ্যা ৪ হাজার ৫৩২টি। ঢাকা মহানগর পুলিশের ৫০ থানা এলাকার দুই ক্যাটাগরির ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মোট সংখ্যা ১ হাজার ৮২৮টি। ঢাকা রেঞ্জের ১৩ জেলা এবং ঢাকা মহানগরের ৫০ থানা এলাকায় দুই ক্যাটাগরির ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মোট সংখ্যা ৬ হাজার ৩৬০টি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম জেলায়। চট্টগ্রাম জেলায় ৩৪৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬৮৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর পরই মুন্সীগঞ্জ জেলার অবস্থান। এই জেলায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ২৭২টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ১০০টি। দিনাজপুর জেলায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২৫৭টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ২৮২টি। নরসিংদী জেলায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ ২৩৭টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ২৭৯টি।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন ৫০ থানা এলাকার মোট ২১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র (লাল) ৬৯৫টি, ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ) ভোটকেন্দ্র ১১৩৩টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৩০৩টি। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ৬০৭টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র (লাল) ৩১২টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র (হলুদ) ১৪৯টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র (সবুজ) ১৪৬টি। খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ৩০৯টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ৭৯টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ১২৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র (সবুজ) ১০২টি। রাজশাহী মহানগর পুলিশের থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ২১৭টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ৮৭টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ১১৬টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৪টি। বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ১৯৯টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ২১টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ৮২টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৯৬টি। সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ২৯৪টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ৯৫টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ১৩৪টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র (সবুজ) ৬৫টি। গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ৩৯৮টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ৮০টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ২২৭টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৯১টি। রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) আওতাধীন থানা এলাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ২০৪টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ৪৭টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র ৭০টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৮৭টি।
রেঞ্জ পুলিশের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জের ১৩ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৮০৩১টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (লাল) ১৯৮০টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ২৫৫২টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৩৪৯৯টি। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৭৩৪৭টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র্র ১৪৪০টি, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র্র (হলুদ) ৩৭৩৭টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ২১৭০টি। খুলনা রেঞ্জের ১০ জেলায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র্র ৭৩০টি, ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ) ভোটকেন্দ্র্র ১৫৬৫টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ২৫২৯টি। রাজশাহী রেঞ্জের ৮ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৫২৮৭টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৮৮১টি, ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ) ভোটকেন্দ্র্র ১৬৭০টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ২৭৩৬টি। বরিশাল রেঞ্জের ৬ জেলার মোট ভোটকেন্দ্র ২৬৩৫টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৬৯৭টি, ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ১০৯২টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ৮৪৬টি। সিলেট রেঞ্জের ৪ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ২৬৪১টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৩৬২টি, ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৮৯৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৩৮১টি। রংপুর রেঞ্জ পুলিশের আওতাধীন ৮ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৪৫৪৬টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৮২৭টি, ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ১৭৩৪টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৯৮৫টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জের আওতাধীন ৪ জেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৩০৯১টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ৪১৩টি, ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) ভোটকেন্দ্র ১০৭২টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৬০৬টি।
এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের দেড় লাখ সদস্য মোতায়েন করা হবে। ভোটের আগে ভোটগ্রহণকালে এবং ভোটপরবর্তী কী ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে তার প্রশিক্ষণ চলছে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যের। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই এই প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার কথা।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করা পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) আবু নাসের মোহাম্মদ খালেদ গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ‘নিরপেক্ষভাবে ভোট অনুষ্ঠানে পুলিশের প্রশিক্ষণ জোরেশোরে চলছে। এছাড়া আরও যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তাও ধাপে ধাপে এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ। আমরা সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দিতে চাই।’
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডিঅর্ন ক্যামেরা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কেন্দ্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য বডিঅর্ন ক্যামেরায় তার ভিডিও ধারণ করবেন। এই ভিডিও ফুটেজ ডিজিটাল অ্যাভিডেন্স হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে। যাতে পরে যে কোনো তদন্তে ব্যবহার করা যায়। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় সর্বনিম্ন তিনজন পুলিশ সদস্য মোতায়েনের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১৩ জন আনসার সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এই ১৩ জনের মধ্যে ৩ জন থাকবেন অস্ত্রসহ আর বাকি ১০ জন থাকবেন অস্ত্র ছাড়া। অস্ত্রবিহীন ১০ জনের মধ্যে ৬ জন থাকবেন পুরুষ আর ৪ জন থাকবেন নারী। এর বাইরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরাসহ বিভিন্ন বাহিনী ভোটকেন্দ্রের বাইরে নজরদারিসহ সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে বিজিবির ১২১০ প্লাটুন সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে বলে বাহিনীটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তিনটি দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও কুতুবদিয়া ছাড়া বাকি সব উপজেলায় বিজিবি থাকবে। সীমান্তবর্তী ১১৫টি উপজেলার মধ্যে ৬০টিতে বিজিবি সদস্য এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে।






















