শফিকুর রহমান–নাহিদ ইসলামের বাসায় যাবেন তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক।।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবার বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের। এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন। সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আপনারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন। তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা- এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। এবার দেশ গড়ার পালা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এ সময় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন তিনি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাপনী বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
বিএনপিকে ভোট দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় উপহার দেওয়ায় দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জনগণের সরাসরি ভোটে দেশে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে; এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিনন্দন জানান। বলেন, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে। কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর, এমনটা দাবি করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, সরকার ও বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তারেক রহমান বলেন, জনমনে সৃষ্ট সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গণতন্ত্রের ইতিহাসে আপনাদের অবদান স¥রণীয় হয়ে থাকবে। এ ছাড়া তিনি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্মকর্তা, জনপ্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকেও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আপনাদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হতো না। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তাদের ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ রাখবেন বলেনও জানান।
সরকার ও দেশ পরিচালনা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছিল দলীয় ইশতেহার। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছিল। আমরা জনগণের কাছে সেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব। তিনি বলেন, এমন আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। তিনি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশা করেছিলেন। দেশ ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই অটল-অবিচল ছিলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন. এবার দেশ গড়ার পালা। এ যাত্রায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে, এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে এ বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে দলটির চেয়ারম্যান বলেন, কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি না করতে পারে। এ জন্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে বিজয় উৎসব পালন করেছি। আমার বক্তব্য স্পষ্ট- যে কোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায় ও বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। দলমত ধর্ম বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই হোক, কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দল-মতে ভিন্নতা থাকলেও প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ-প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহির মাধ্যমে আমরা একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি। একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সবার সহযোগিতা আশা করছি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে তারেক রহমানের পাশে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জবিউল্লাহ প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।























