অনলাইনে অবাধে বিক্রি হচ্ছে পাখি, নির্বিকার প্রশাসন

0
7

অনলাইন ডেস্ক।।
অনলাইনে অবাধে বিক্রি হচ্ছে পাখি, নির্বিকার প্রশাসন
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের শহিদুল ইসলাম একটি ময়নাপাখি বিক্রি করবেন। পাখি ডট কম নামে ফেসবুকে পরিচালিত একটি গ্রুপে দিয়েছেন বিজ্ঞাপন। সেই সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হলে মূল্য হাঁকেন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। পাখাল ডট কম নামে আরেকটি গ্রুপে গাইবান্ধা থেকে আহসান হাবিব ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন একটি কথা বলা ময়না পাখি।
আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী শিকার, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ বা হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে এসব পরিযায়ী পাখিসহ নানা বন্যপ্রাণী। বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট হলেও না জানার দোহাই দিয়ে দায় সারার চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরিবেশবাদীদের সমালোচনার মুখে মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল হোতারা। আর ২-১ টি পাখি বা প্রাণীসহ ধরা পড়লে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয় লোক দেখানো জরিমানা বা মুচলেকা নিয়ে। আর এসব কারণেই দেশজুড়ে পাখি শিকারের প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা গবেষকরা। একইসঙ্গে দেশ থেকে দেশের বাইরে বন্যপ্রাণী পাচারের হার বাড়ছে বলেও দাবি তাদের।
নিয়মিত পাখি বেচাকেনা হয় এমন কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজর রেখে পাওয়া যায় তার বাস্তবতাও। ফেসবুকে সার্চ দিলে পাখি ডট কম, পাখি ক্রয়-বিক্রয়, পাখাল ডটকম, তোতা ময়না পোষাপাখিসহ অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রুপ পাওয়া যায়। যার সবকটিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ময়না, টিয়া, ঘুঘু, কালিম, বক, শালিক, দোয়েলসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পাখি বিক্রি করা হয়। পাখি ডটকম নামের গ্রুপটিতে একমাস নজর রেখে দেখা যায় গড়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ জোড়া পাখি বিক্রি হচ্ছে। যার পেছনে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে অর্ধলাখ টাকার বেশি।
কিন্তু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে হচ্ছে এ ব্যবসা। জানতে সময় সংবাদের পক্ষ থেকে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় বিক্রেতাদের সঙ্গে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কালিম পাখি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন জাহিদ হাসান। তিনি জানান, ৪ হাজার টাকায় একটি কালিম পাখি কিনলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় নিরাপদে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব তার। তবে এর জন্য দিতে হবে আলাদা টাকা। গণপরিবহনের শ্রমিকদের মাধ্যমে এ কাজ করা হয় বলেও জানান তিনি।
প্রায় একই কথা জানান, নোয়াখালী থেকে বালিহাস বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া রাসেল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক এস এম জহির উদ্দিন আকন দাবি করেন, নজরে এলেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা। উদাহরণ হিসেবে গেল আগস্টে ফাঁদ পেতে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে দুজন অনলাইন পাখি বিক্রেতাকে আটক করার প্রমাণ তুলে ধরেন তিনি।
কিন্তু ১২ আগস্ট ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় চালানো সেই অভিযানের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, আটককৃতরা দুজনই ছিল খুচরা পর্যায়ের পাখি বিক্রেতা। যাদের ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হয়। অনলাইন মাধ্যমের সূত্র ধরে তাদের আটক করা হলেও জরিমানা করা ছাড়া গ্রুপ এডমিন বা চক্রের মূল হোতাদের ধরতে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের আর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। কেন করা হয়নি প্রশ্ন ছিল বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তার কাছে।
‘এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই, অনলাইন এক্সপার্টও নেই, যানবাহনসহ কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। এমন পরিস্থিতিতে যা চলছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া বিকল্প নেই’, জবাবে বলছিলেন জহির উদ্দিন আকন।
তবে বন্যপ্রাণী অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন বিভাগ ও পুলিশ আন্তরিক হলেই সম্ভব বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। আর এজন্য জনবলের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সমন্বয়কে। কাজে লাগাতে হবে দেশের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলোকে।
বন্যপ্রাণী পাচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন চাইনিজ একাডেমী অব সাইন্সের বন্যপ্রাণী গবেষক ডা. নাছির উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘পাখি বা বন্যপ্রাণী শিকার যে অপরাধ এটি আমাদের দেশের অনেকে জানেই না। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে বন বিভাগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচি চালাতে হবে। জনগণকে জানানোর জন্য এসব এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচি ফলাও করে প্রচারও করতে হবে।’
‘আমাদের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের গঠনপ্রণালীটা পরিবর্তন করতে হবে। এখানে পুলিশের এক বা একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে যুক্ত করতে হবে, আইটি এক্সপার্ট রাখতে হবে, সর্বপরি বন্যপ্রাণী রক্ষায় আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার মতো কিছু মানুষ লাগবে’, বলছিলেন বন্যপ্রাণী গবেষক নাছির উদ্দীন।পাখি কমে গেলে ফসল উৎপাদন কমে যাবে, পোকামাকড়-পঙ্গপাল ও রোগব্যাধি বাড়বে বলে জানিয়ে নিজেদের স্বার্থে বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনগণকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এ গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here