কারিগরিতে নারী শিক্ষার্থীরা উপস্থিতি কম

0
8

পদ্মা সংবাদ ডেস্ক:দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তুলতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সাথে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী শিক্ষার প্রতিও দিয়েছে বিশেষ নজর। এ জন্য সাধারণ শিক্ষায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় সমান। তবে দেশের কারিগরি শিক্ষায় এখনো পিছিয়ে নারীরা।

বরং গত কয়েক বছরে কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনেকাংশে আগ্রহ কমেছে নারী শিক্ষার্থীদের। তারই ধারাবাহিকতায় গত ছয় বছরে কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ কমেছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

কারিগরি শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব রয়েছে। দক্ষ শিক্ষকের অভাবও প্রকট। ফলে সামগ্রিকভাবে কারিগরি শিক্ষা সাধারণ পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। একই কারণে নারীদের মধ্যে আগ্রহও বাড়েনি।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, যে পরিমাণ শিক্ষার্থী পলিটেকনিকসহ কারিগরি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছে, তাদের তেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। আবার ব্যবহারিক কাজে মেয়েদের কিছুটা কম গুরুত্ব দেয়া হয়। এ জন্য নারী শিক্ষার্থীদের এদিকে আগ্রহ কম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৩ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষার্থী বেড়েছে এক লাখ তিন হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৫৬ হাজার ২০৫ জন। বাকি ৪৭ হাজার ২২৯ জন ছাত্র।

অর্থাৎ ছাত্র থেকে ছাত্রী বেশি। আবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৯ হাজার ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৫০৫ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ ছাত্র ও ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৯ জন ছাত্রী। এখানেও ছাত্র থেকে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি।

অর্থাৎ, গত কয়েক বছর সাধারণ শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থী বাড়ার বদলে কমেছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, কারিগরিতে ২০১৩ সালে মেয়েদের হার ছিলো ২৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ২৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ২৪ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ২৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।অর্থাৎ, গত ছয় বছরে কারিগরিতে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ কমেছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) ড. মো. নুরুল ইসলাম। আমার সংবাদকে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে কারিগরিতে নারীদের অংশগ্রহণ যে পরিমাণ ছিলো, চলতি বছরে তা কিছুটা কমেছে।

কেন কমেছে তার কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, টেকনোলজিতে মেয়েদের চাকরি পেতে কিছুটা প্রবলেম হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা কমতে পারে।

তিনি আরও বলেন, তবে নারীদের কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী করতে তাদের জন্য আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মহিলা পলিটেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে শিগগিরই কারিগরিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়বে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ফাতেমা তাবাসসুম আমার সংবাদকে বলেন, নারী শিক্ষার্থী কমার প্রধান কারণ কর্মসংস্থানের অভাব। এ সেক্টরে নারীর কর্মসংস্থান এখনো কম। লায়লা আফরিন নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, পারিবারিক কারণেও অনেকেই কারিগরিতে পড়তে চান না।

অনেক অভিভাবক মনে করেন, বেশি কষ্ট করে না পড়ে সাধারণ শিক্ষা নিয়ে পাস করলেই ভালো। কেননা, মেয়ে পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করবে, তাকে দক্ষ গতে হবে এমনটি অনেকেই ভাবতে চান না। তাই তাদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে অনেক ধোয়াশা রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার বর্তমানে ১৫ শতাংশ। সরকার এটিকে মাইলফলক বলে মনে করছে। ২০২০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরিতে আসবে বলেও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বর্তমানে আট হাজার ৬৭৫টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এখন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার প্রায় ১৬ শতাংশ হয়ে গেছে, যা ২০০৯ সালে ছিলো ১ শতাংশের মতো। কারিগরিতে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে কোটাও সংরক্ষণ করা হয়। কারিগরিতে ভর্তির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ মহিলা কোটা সংরক্ষণের নিয়ম ছিলো।

সম্প্রতি তা ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের ২৩ জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। যার ফলে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৫ এ।

বর্তমানে যার সংখ্যা ৫২টি। শুধু নারী শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে সরকার আলোচ্য সময়ে সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

এগুলো হলে মহিলা পলিটেকনিক্যালের সংখ্যা দাঁড়াবে আটটিতে। বর্তমানে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে চারটি। যেগুলো ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, গত ১০ বছরে টেকনিক্যাল শিক্ষার অনেক উন্নতি হয়েছে। এ সময়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০০৯ সালে ছিলো ১ শতাংশ। এখন প্রায় ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরিতে পড়ছে। নারীদের অংশগ্রহণ যে কমে গেছে তা বলবো না। শুধু নারীদের কারিগরি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে আটটি বিভাগে মহিলা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কারিগরি শিক্ষা ছাড়া এখন বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সবাই সচেতন হলে কারিগরিতে খুব শিগগিরই শিক্ষার্থী আরও বাড়বে।

নারী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি-না, তা জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা শুধু শিক্ষার বিষয়টিই নিশ্চিত করতে পারি। তবে শিক্ষার্থীদের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সংযোগ তৈরির জন্য ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা রেখেছি। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে সহজেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়তে পারবে।

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে এর আগে গণমাধ্যমে বলেছেন, কারিগরিতে যেটুকু উন্নয়ন এখন দেখা যাচ্ছে, তা গত ১০ বছরে হয়েছে। বর্তমানে এই শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ১৬ শতাংশ। তবে আমরা কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার সমান করতে চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here