দুদকের জালে ১২ এমপি

0
15

অনলাইন ডেস্ক।।

সরকারি টাকা মেরে খাওয়া, খাসজমি দখল করে নিজের নামে নেয়া, ঘুষ খাওয়া, ক্যাসিনো থেকে টাকা খাওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজেই জুয়ার ব্যবসা খুলে দেয়া, কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, সবই চলেছে দেদার। তবে দিনের পর দিন অবৈধভাবে এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পকেট ভরলেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। দুদকের জালে আটকা পড়ছেন বর্তমান সংসদের ১২ এমপির। এদের ১১ জনই সরকারি দলের। এই তালিকায় আছেন ১০ জন সাবেক সাংসদও।

শুধু দুদকই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, গণপূর্তসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও তাদের অপকর্ম বের করতে মাঠে নেমেছে। সব অপকর্মের তথ্য হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব শিগগিরই এসব অপকর্মের হোতাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক। সম্প্রতি তেমনি ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বাধীন সংস্থাটির কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান।

এর মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা নিজ দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন। শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই নয়, নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার সাধারণ জনগণও তাদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। সবমিলিয়ে কপাল পুড়ছে এসব সাংসদের।

জানা যায়, অনুসন্ধানাধীন থাকা সাংসদদের মধ্যে ১২ জন বর্তমান এবং ১০ জন সাবেক। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১১ জন, বিএনপির পাঁচজন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র থেকে ছয়জন এমপি রয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের তিন এমপির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও সর্বোপরি ভালো চরিত্র জেনে মনোনয়ন দিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। মনোনয়ন পেয়ে ভোটে জয়লাভ করে সাংসদও নির্বাচিত হয়েছেন। এরপরেই তারা আখের গোছাতে শুরু করেন। সরকারি-বেসরকারি মিলে সবকটি খাত থেকেই ভাগবাটোয়ারা নিতে থাকেন। অর্থপাচার করে বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করেন। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

দুদক সূত্র জানায়, শুধু সাংসদই নয়, তাদের পরিবারের সদস্য এবং কোনো ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধানের পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট। সাংসদদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানের কাজে সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দুদক কার্যালয়ে জমা দেয়া সাংসদ ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সম্পদ বিবরণী এবং অনুসন্ধানী কর্মকর্তাদের পাওয়া তথ্যে গরমিল থাকার পাশাপাশি দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, খাসজমি ইজারায় দুর্নীতি, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ অন্তত ১৫/২০ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষে খুব শিগগিরই ওই সব সাংসদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে কমিশন।

যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে তারা হলেনÑ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন (সুনামগঞ্জ-১), নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন (ভোলা-৩), সামশুল হক চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১২), নজরুল ইসলাম বাবু (নারায়ণগঞ্জ-২), পঙ্কজ দেবনাথ (বরিশাল-৪), ওমর ফারুক চৌধুরী (রাজশাহী-১), মাহী বি চৌধুরী (মুন্সীগঞ্জ-১), আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব (ভোলা-৪), হাজী সেলিম (ঢাকা-৭), কাজী সহীদ ইসলাম পাপুল (ল²ীপুর-৪) ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ সেলিমা ইসলাম। এর মধ্যে সর্বশেষ দুজনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মামলা করেছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ ও ১৪৮ কোটি টাকার পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই দম্পতি ছাড়াও তাদের কন্যা ওয়াফা ইসলাম ও সহিদুল ইসলামের শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ বি এম মোজাম্মেল হক (শরীয়তপুর-১), সাবেক স্বতন্ত্র সাংসদ কামরুল আশরাফ খান পোটন (নরসিংদী-২), এ কে এম এ আউয়াল (পিরোজপুর-১), সাবেক স্বতন্ত্র সাংসদ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা (নরসিংদী-৩), সাবেক এমপি শামসুল হক ভূঁইয়ার (চাঁদপুর-৪) বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চলছে। বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেনÑ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (নাটোর-২), আসাদুল হাবিব দুলু (লালমনিরহাট-৩), মো. শাহজাহান (নোয়াখালী-৪), আব্দুল মোমিন তালুকদার (বগুড়া-৩) ও সাবেক সাংসদ মো. শহিদুজ্জামান ইসলাম বেল্টু (ঝিনাইদহ-৪)। এছাড়া জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব সাবেক সাংসদ এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের (পটুয়াখালী-১) বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে দুদক।

এর মধ্যে সাবেক সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় বরিশালে ৩টি মামলা দায়ের করেন। তিনটি মধ্যে দুইটি সাবেক এমপি আউয়াল এবং একটিতে তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকে আসামি করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আরো দুটি মামলা করা হয় এই দম্পতির বিরুদ্ধে। এর মধ্যে এক মামলায় ৩৩ কোটি ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫৫ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে মোট ১৫ কোটি ৭২ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩ টাকার সম্পদ গোপন করার প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, তার স্ত্রী লায়লা পারভীন ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৯০ হাজার ৫০ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করায় দুর্নীতি দমন আইন ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২), ৪ (৩) -এ অপর একটি মামলা দায়ের করা হয়।

এ বিষয়ে দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে থাকা সাংসদদের বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা থেমে নেই। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনুসন্ধান শেষে যথাসময়ে তাদের আইনের সম্মুখীন করা হবে। এ ব্যাপারে কোনো বিলম্ব হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, দলমত ও ব্যক্তির ঊর্ধ্বে আমরা কাজ করছি। আইন অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন হবে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here