ভাস্কর্য প্রশ্নে কঠোর সরকার

0
28

অনলাইন ডেস্ক।।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষে রাজধানী ঢাকার ধোলাইপাড় মোড়ে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ভাস্কর্যকে অনৈসলামিক দাবি করে তা বন্ধের জন্য জল ঘোলা করার চেষ্টা রয়েছে কট্টরপন্থি হেফাজতে ইসলাম। এমনকি ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল করা না হলে তা ‘টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেয়া’সহ আবার শাপলা চত্বরে আন্দোলনে নামার হুমকিও দেয়া হয়েছে। অবশ্য এসব হুমকিকে আমলে না নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্যও করেনি বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজতিদের মনগড়া ব্যাখ্যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের সংস্কৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে জনগণের শান্তি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা সরকার রুখে দেবে- এমন হুঁশিয়ারি তাদের। তবে এখনি সরাসরি মাঠে না নেমে নাগরিক সমাজ ও সহযোগী সংগঠনকে দিয়ে ভাস্কর্যবিরোধীদের জবাব দেয়ার কৌশল আওয়ামী লীগের। যে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা মোকাবিলায় সতর্ক রাখা হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে কিছুতেই পিছু হঠবে না সরকার। এ নিয়ে হেফাজতিদের যে কোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে বদ্ধপরিকর ক্ষমতাসীনরা।

হেফাজতে ইসলামের নতুন আমীর জুনাইদ বাবুনগরী শুক্রবার এক সমাবেশে যে কোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। মদিনা সনদে যদি দেশ চলে, কোনো ভাস্কর্য থাকতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মদিনা সনদে দেশ চলবে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। মদিনা সনদে যদি দেশ চলে, ইসলামবিরোধী কোনো কাজ হতে পারবে না। আর হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের দাবি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অনৈসলামিক। ইসলামে ভাস্কর্য নির্মাণ নিষেধ দাবি করে ১৩ নভেম্বর এক সমাবেশে তা বন্ধের দাবি তোলেন মামুনুল হক। শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যই নয়, ঢাকা শহরের সব ভাস্কর্যকেই অনৈসলামিক দাবি করে হুঁশিয়ারিও জানান তিনি।

মামুনুল বলেন, আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি, এই মসজিদের শহরের গৌরবময় পরিচয়কে মুছে দিয়ে এটাকে মূর্তির শহরে পরিণত করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। এ দেশের তৌহিদী জনতা আবার শাপলা চত্বরে যাবে। শুক্রবার হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজত ইসলামের ওই মাহফিলে অন্যতম প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা ছিল মামুনুল হকের। কিন্তু যুবলীগ-ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিরোধের মুখে তিনি বক্তৃতা দিতে পারেননি।

ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে কট্টরপন্থিদের মন্তব্যে সরকারে থাকা দল আওয়ামী লীগ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে মামুনুলের এমন উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন। দেশের কোনো স্থানে মামুনুল হককে ওয়াজ করতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ। যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান সংগঠনটির নেতারা। গতকাল রবিবার রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে মানববন্ধন করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ। এতে যোগ দেয় সংগঠনের ঢাকা মহানগরের সব ইউনিট। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে যুবলীগও। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যে অনাহূত বিতর্কের সৃষ্টি করছে, তার ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেন, ভাস্কর্য নিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের সংস্কৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ। ভাস্কর্যকে যারা মূর্তি বলে অপপ্রচারে নেমেছে তারা নিজেরাই ভ্রান্তিতে আছে, দেশের আলেম সমাজ এবং বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই বারবার বলেছেন মূর্তি আর ভাস্কর্য এক নয়। ওবায়দুল কাদের হুঁশিয়ার করে বলেন, জনগণের শান্তি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা করলে জনগণই রুখে দাঁড়াবে।

দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই জাতির পিতার ভাস্কর্যের বিরোধিতা হচ্ছে বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা। জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, মূর্তি আর ভাস্কর্য দুটি ভিন্ন। যারা এই দুটির পার্থক্য জানে না, তারা অহেতুক বিতর্ক করছে। যারা আবার শাপলা চত্বর থেকে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল, তাদের কোনো হুমকি কাজে আসবে না- এমনটাই মনে করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। সরকারের শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তারা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠিত হবেই, এটি ঠেকানোর কারো শক্তি নেই বলে মন্তব্য করে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, মক্কা নগরীর মানুষই ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলে না। হেফাজতের লজ্জা থাকা উচিত। তারা জঙ্গিদের ভাষায় কথা বলছেন। একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, এখানে পাকিস্তানের প্রেতাত্মা বা রাজাকারদের হুমকি শোনার জন্য ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়নি। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান বলেন, ভাস্কর্য আর মূর্তি- দুটো এক জিনিস নয়, বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। পাকিস্তানে যান, ভারতে যান, সারা বিশ্বে যে কোনো রাষ্ট্রে যান না কেন, সব জায়গাতে ভাস্কর্য আছে। ভাস্কর্য যদি মূর্তি হয়, তাহলে টাকার ভেতরে বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে, আগে যারা ছিলেন তাদের ছবি ছিল, সেগুলো পকেটে নিয়ে তো সবাই ঘুরে বেড়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের সব দুষ্টচক্রকে কঠোর হস্তে দমন করে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একটি চক্র বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে মন্তব্য করে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, তাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে বাংলাদেশকে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মতো হতে দেয়া হবে না। তরুণদের মারমুখী না হয়ে আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তির মাধ্যমে পরাজিত শক্তির উত্থান ঠেকানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

প্রয়োজন সম্মিলিত আওয়াজ : হেফাজত ইসলামসহ সব মৌলবাদ রুখে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ লড়াই- এমন আহ্বান বিশিষ্টজনদের। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক উগ্রশক্তি নির্মূলে বঙ্গবন্ধু সরকারের চার মূলনীতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। হেফাজতকে নিয়ে এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, ওদের মূল বিষয় ভাস্কর্য নয়; বরং এরা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসতে চায়। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ ও শক্তির জানান দিতে চায়। এদের পাত্তা দেয়ার কিছু নেই। এর আগেও ভাস্কর্য নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সরকার তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অটল থাকাই হবে হেফাজতকে উপেক্ষা করা।

মৌলবাদ রুখে দিয়ে সারাদেশে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস। এ ব্যাপারে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, হেফাজতসহ সব মৌলবাদকে রুখে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কাজে শুধু সরকার নয়, প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠনের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভাস্কর্য একটি দেশের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। সব মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে। মৌলবাদরা শুধু সংস্কৃতির ওপরই আঘাত করছে না, তারা পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন চায়, আইনের পরিবর্তন চায়। এদের রুখে দেয়ার বিকল্প নেই।

সারাদেশে আন্দোলন: মামুনুল হকসহ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল মঙ্গলবার সারাদেশে একযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধমঞ্চ। এ ছাড়া ওইদিন শাহবাগ থেকে মৎস্যভবন পর্যন্ত মানববন্ধন করবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।

মৎস্যজীবী লীগের মানববন্ধন : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যবিরোধী হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হককে ‘তালেবানের প্রতিনিধি’ বলে মন্তব্য করেছে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন মৎস্যজীবী লীগ। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোড রাসেল স্কয়ারে ‘মৎস্যজীবী লীগের’ স্বীকৃতির এক বছর ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণের হুমকির প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধনে এ কথা বলেন তারা। নেতারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য মানেই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে স্বীকার করে নেয়া। অনতিবিলম্বে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান তারা।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here