সাহসী চোর

0
41

রুদ্র অয়ন এর ছোটগল্প
সাহসী চোর

অনেক যুগ আগের কথা। তখনকার দিনে এখনকার মতো আধুনিক সুযোগ সুবিধাময় হোটেল কিংবা মুসাফিরখানা ছিলোনা। কিন্তু বাণিজ্য ছিলো, ব্যবসায়ী ছিলো। মালামাল নিয়ে তাদের এক শহর থেকে অন্য শহরে, দূর দূরান্তে যাবার প্রয়োজনীয়তা ছিলো। দূরের মুসাফিরদের জন্যে তখন ছিলো সরাইখানা। ব্যবসায়ী, মুসাফিররা ঐসব সরাইখানায় রাতের বেলা বিশ্রাম নিয়ে সকালে আবার রওনা দিতো গন্তব্যে। এ রকম সরাইখানার মধ্যে দূর্গের মতো একটি সরাইখানা ছিলো বেশ নামকরা। দূর্গের মতো মানে দেয়ালগুলো ছিলো অনেক উঁচু উঁচু। আর এতে প্রবেশের মূল দরোজা ছিলো ইস্পাতের তৈরি মজবুত- শক্ত ।
কোনো চোরের পক্ষেই সে দরোজা ভেঙে প্রবেশ করার সাধ্য ছিলোনা। এ কারণে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তমনে এই সরাইখানায় বিশ্রাম নিতো।

সরাইখানার ভেতর এবং বাইরের পরিবেশ ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। চার চোর একদিন যুক্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো তারা যে-কোনো উপায়েই হোক ভেতরে ঢুকবেই। চুরির পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য ছিলো এই প্রাসাদে যে চোর ঢুকতে পারবে না বলে গর্ব করা হয়, সেই গর্ব ভেঙে দেওয়া। চারজন চোর বহু চিন্তাভাবনা করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো মাটির অনেক নীচ দিয়ে একটা সুরঙ্গ বানাবে যে সুরঙ্গ সরাইখানার প্রতিরক্ষা প্রাচীরের নীচে দিয়ে ভেতরে গিয়ে শেষ হবে। তারা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার নিয়ে সুরঙ্গ খুঁড়তে শুরু করে দিলো। অনেকদিন পর তারা সুরঙ্গের কাজ শেষ করলো সরাইখানার ভেতরের একটি কূপের মাঝখানে এসে। এরপর এক অন্ধকার রাতে চোরেরা নীরবে নিঃশব্দে সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে এসে সরাইখানায় ঢুকে পড়লো এবং ব্যবসায়ীদের মালামাল সব চুরি করে সুরঙ্গের ভেতর দিয়েই আবার পালিয়ে গেলো।

সকাল হতেই সরাইখানায় চুরির খবর বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো। খবরটি শুনে প্রশাসনের এক উর্ধতন কর্মকর্তা সরাইখানায় গেলেন। তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছিলো না, এতো মজবুত দেয়াল পেরিয়ে কিংবা লোহার দরোজা ভেঙে চোর ঢুকতে পারে সরাইখানায়! প্রশাসনের কর্মকতার সাথে আসা কিছু সেপাই ভালো করে পুরো সরাইখানা ঘুরে ফিরে দেখলো,কিন্তু কোত্থাও কোনো নাম নিশানাও দেখলো না। না কোনো সিঁদ কাটার চিহ্ন আছে না আছে কারো পায়ের ছাপ! কর্মকর্তা বললেল,‘তাহলে নিশ্চয়ই এটা সরাইখানারই কারো কাজ হবে।’
সরাইখানার ভেতরে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেলো। দারোয়ানদেরকে ডেকে এনে লাথি ঘুষি মেরে কথা বের করার প্রক্রিয়া শুরু হলো। কিন্তু কিছুতেই তারা বলতে পারলো না কে চুরি করেছে। চোরদের সাথে তাদের হাত থাকার বিষয়টিও বোঝা গেলোনা। এই ফাঁকে চোরেরা কিন্তু মালামাল নিরাপদ স্থানে রেখে সরাইখানায় ফিরে এলো কি কাণ্ড ঘটছে তা দেখার জন্যে।
এসেই তারা দেখলো দারোয়ানদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কষ্টে বেচারাদের চিৎকার আকাশে ছড়ালো। চোরদের সর্দার দারোয়ানদের কষ্ট দেখে মনে মনে বললেন- যারা কোনও দোষ করেনি, তাদেরকে এমন শাস্তি দেওয়া কোনও ক্রমে উচিত নয়; এটা অন্যায়।
সে একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বললো, ‘থামো।’
সাথে সাথে সবার দৃষ্টি পড়ে গেলো তার ওপর। চোরের সর্দার আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বললো, ‘এদের সবাইকে ছেড়ে দাও! তারা নিদোর্ষ। আমিই চুরি করেছি।’
প্রশাসনের কর্মকর্তা তার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তুমি চুরি করেছো, কিভাবে করলে এটা?’
চোরের সর্দার বললো, ‘আমি একটা সুরঙ্গ তৈরি করেছি,যার সংযোগ কূপের সাথে।’
সবাই তখন কূপের কাছে চলে গেলো।

কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যবসায়ীদের মালামাল কোথায়? সত্যি বলো, চুরি করা মালগুলো কোথায়?’ চোর বললো, ‘কূপের ভেতরে। যে কেউ গিয়ে দেখে আসতে পারেন।’ কিন্তু কেউ যেতে সাহস করলো না। অবেশেষে চোরের সর্দার একটা পরামর্শ দিলেন। তার পরামর্শে তারই কোমরে শক্ত দড়ি বেঁধে দেওয়া হলো এবং তাকেই পাঠানো হলো কূপের ভেতর। চোর তো সুরঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছে কোমরের দড়ি খুলে দড়ির মাথায় বড়ো একটা পাথর বেঁধে সুরঙ্গ পথে পালিয়ে গেলো। তার সঙ্গীরাও আস্তে আস্তে পেছনে যেতে যেতে সরাইখানার সদর দরোজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। প্রশাসনের কর্মকর্তা সহ সরাইখানার ব্যবসায়ী মুসাফিররা অনেক সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করলো কিন্তু কূপের ভেতর পাড়ি জমানো চোরের কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছেনা!

সবাই পরামর্শ শুরু করলো, কি করা যায়। অবশেষে প্রশাসনের কর্মকর্তার আদেশে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে একজন সেপাই গেলো কূপের ভেতর। সে সুরঙ্গ পথটি পেয়ে গেলো এবং সেই পথ দিয়ে বের হয়ে সরাইখানার মূল দরোজায় এসে চিৎকার করে উঠলো। সবাই কূপের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। চিৎকার শুনে সেপাইকে দেখে সবাই বুঝে গেলো চোর সত্যিই বলেছে। সরাইখানার সাথে বাইরে যাওয়া আসার জন্যে একটা সুরঙ্গ পথ আছে। কর্মকর্তা তাড়াতাড়ি দারোয়ানদেরকে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দিলো। তিনি কি সব ভাবছিলেন। হঠাৎ এক ব্যবসায়ী মুসাফির, যার কিছু মাল চুরি হয়েছিলো সে চিৎকার করে বললো, ‘আমি আমার মালামাল ঐ সৎ সাহসী চোরকে দান করে দিলাম। আমার মালগুলো তারই, সেগুলো তার জন্যে হালাল করে দিলাম। এই জন্যে যে, ঐ চোর ছিলো খুব বুদ্ধিমান। এই রকম একটা সুরঙ্গ- টানেল বানানো চাট্টিখানি কথা নয়! এতো কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে এরকম একটা নিরাপদ পথ আবিষ্কার করা মোটেও সহজ কথা নয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, চোরটির সৎ সাহস আছে এটা স্বীকার করতেই হবে। সে নিরীহ নিরপরাধ দারোয়ানদেরকে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। চুরি অবশ্যই একটা খারাপ কাজ। কিন্তু কেউ যদি খারাপ কাজ করেও বসে, তারচেয়ে উত্তম হলো চোরটির মতো সৎ সাহসী এবং পৌরুষদীপ্ত হওয়া। কেউ কোনোরকম খারাপ কাজ করার পরও যদি নির্দোষ মানুষদের শাস্তি পেতে দেখে নিজের দোষ স্বীকার করার মতো সৎ সাহস রাখে ও নিরপরাধ মানুষদের মুক্তির ব্যাবস্থা করে দেয় তবে তার অপরাধ ক্ষমাযোগ্য বলে মনে করি।’
আমাদের দেশের অনেক নেতাইতো অন্যের হক মেরে খায়, লুটপাট করে, ঘুষ- দূর্নীতি, অনিয়মের সাথে জড়িত! কিন্তু নিজের দোষ কখনও স্বীকার করেননা! নিজেদের হীন স্বার্থে অন্যের জীবন নিয়ে খেলতেও পিছপা হোন না! অন্যের ক্ষতি করে হলেও নিজেরা সম্পদের পাহাড় গড়েন, এমনকি তারা নিজেদের স্বার্থে অন্যের জীবন নিতেও ছাড়েন না ! ঐসব কুলাঙ্গারদের ক্ষমা করা যায়না, ওরা ক্ষমার যোগ্য নয়।
– রুদ্র অয়ন
ঢাকা, বাংলাদেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here