সুকুমার রুজ – এর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সংগ্রাম মিত্র

0
17

সংগ্রাম : সুকুমারদা ‘ , আপনি এই দুঃসময়ে কেমন আছেন ? সুকুমার : শারীরিকভাবে ভালাে আছি , কিন্তু মানসিকভাবে ভালাে নেই ভাই । লেখালেখির মধ্যে থাকলেই ভালাে থাকি । আর না লিখতে পারলেই । সংগ্রাম : হ্যা , এটা ঠিকই বলেছেন , লেখক মানুষদের তাে লেখাটাই আসল কাজ । তাে আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে হলাে , একটু বলবে ? সুকুমার : আমার লেখালেখি শুরু সেই ছাত্রবেলায় স্কুলের ম্যাগাজিনে কবিতা লেখা দিয়ে । ক্লাস টেনে উঠে দু’একটা গল্পও লিখেছি শরৎচন্দ্র , বিভূতিভূষণের সাহায্য নিয়ে । ক্লাস ইলেভেনে প্রথম কো – এডুকেশন ক্লাস । তখন বয়ঃসন্ধি কাল । তাই সহপাঠীনিদের প্রতি অদম্য কৌতূহল । ওদের কাছে প্রাধান্য পাওয়ার জন্য কবিতা লেখায় বেশি বেশি মনােনিবেশ । কাউকে অন্যরকম ভালাে লাগলে তা কবিতায় প্রকাশ , আবার তার উপেক্ষা , অবজ্ঞা পেলেও তার প্রকাশ কবিতাতেই । কলেজে গিয়ে সেটা একটু বাড়ল । নদী থেকে যেন সাগরে গিয়ে পড়লাম । সংগ্রাম : বাঃ ! দারুণ বললেন তাে ! তা সাগরে পড়লেন কত সালে ? সুকুমার : সেটা ১৯৮১ সাল । তখন বয়স মাত্র আঠারাে বছর । ‘ আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ । স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি , / আঠারাে বছর বয়সেই অহরহ । বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উকি । ‘ তখন সত্যি আমি দুঃসাহসী । অনেক বন্ধু , অনেক বান্ধবী । তীব্র আকর্ষণ , তুমুল্কামনা , তিক্ত প্রত্যাখ্যান , অন্তরঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে অন্তঃসলিলা প্রতিযােগিতা , এসব কিছু কবিতায় ধরা সম্ভব হয়ে উঠছিল না । তাই দু’একখানা প্রেমপত্র লেখার সঙ্গে সঙ্গে দু’একখানা গল্পও লেখা শুরু করলাম । কলেজ শেষ হতে না হতেই পেয়ে গেলাম একটা চাকরি । প্রথম পােস্টিং বােম্বেতে , মানে এখনকার মুম্বাইয়ে । সংগ্রাম : কলেজ শেষ হতে না হতেই চাকরি ! ইউনিভার্সিটি যাননি ? সুকুমার : না ভাই , সে দুর্ভাগ্য আমার হয়নি । সংগ্রাম : হাঃ হাঃ হাঃ ! ভালাে বলেছেন । এখনকার সময় হলে দুর্ভাগ্যই বটে । তা কিসে চাকরি পেলেন ? সুকুমার : শিপিং কর্পোরেশনে । বাংলায় হল না । একেবারে বাবা – মা আত্মীয় – পরিজন ছেড়ে দূরদেশে । ভিন্ন পরিবেশ , ভিন্ন ভাষা , তাই কেমন যেন একা হয়ে গেলাম । সেই একাকীত্ব কাটাতে প্রাত্যহিক দিনলিপি লেখা । তা করতে গিয়ে কখন যে গল্প তৈরী করতে শুরু করেছি ! ডায়েরির পাতা আর রােজনামচায় সীমাবদ্ধ রইল না , গল্প হয়ে উঠতে লাগল । একসময় দেখি , গল্প লেখা বেড়েই চলেছে । সংগ্রাম : আচ্ছা , গল্প বাড়তে থাকুক । তার আগে আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটা একটু শুনে নিই । সুকুমার : আমার বেড়ে ওঠা অসাধারণ কিছু নয় , অবহেলায় জংলা গাছ বেড়ে ওঠার মতাে । জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি বাংলার এক গ্রামে । ক্ষেত – খামার , বনজঙ্গল নদী ঘেরা প্রকৃতি মায়ের কোলে । ছেলেবেলায় ‘ পথের পাঁচালি পড়ে নিজেকে ‘ অপু ‘ ভাবতাম । তাই বনবাদাড়ের সাথে সখ্যতা । নিম – মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হওয়ায় বাড়িতে খুব বেশি রক্ষনশীলতা ছিল না । তাই মাঠে – ঘাটে কাজ করা চাষী , মুনিষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী , চাকরি – বাবু , শিক্ষক , ডাক্তার সকলের সঙ্গেই আমার নিবিড়তা ছিল । আমি ছােট হলেও সকলের কাছে গুরুত্ব পেতাম দুটি কারণে । প্রতিবেশী শিক্ষিত মানুষেরা আমার সঙ্গে কথা বলতেন গ্রামের মধ্যে বা গ্রামের স্কুলের মধ্যে আমি সেরা ছাত্র এই সুনামের জন্য । আর অশিক্ষিত সমাজবন্ধুদের কাছে গুরুত্ব পেতাম প্রচণ্ড ডানপিটে হওয়ার জন্য । চাষীর সঙ্গে বন্ধু পাতিয়ে জমিতে লাঙল দেওয়া , গরুর গাড়ি হাঁকানাে । জেলের সঙ্গে মিশে পুকুরে খালে – বিলে খ্যাপলা জাল ফেলা । মাঝির স্যাঙাৎ হয়ে নৌকার দাঁড় বাওয়া ,

হাল ধরা এসব যেমন শিখেছি , তেমনি গাছে চড়া , ছােট ঘােড়া , মানে খচ্চরের পিঠে চড়া , পুকরে , নদীতে সাতার কাটা অবলীলায় শিখে গেছি । সংগ্রাম : আপনি ঘােড়ায় চড়তেও জানেন ? সুকুমার : জানতাম । এখন এই বয়সে হয়তাে আর পারব না । তবে গাছে চড়তে এখনাে পারি । ছেলেবেলায় পুকুরপাড়ের উচু গাছ থেকে পুকুরের জলে ঝাপ দেওয়া তাে ছিল প্রিয় খেলার একটি । মাঠে ময়দানেও কম দুর্দান্ত ছিলাম না । ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়ে একমাস বিছানায় । ক্রিকেট খেলতে গিয়ে মুখে বল লেগে ঠোট ফেটে রক্তারক্তি । এক সপ্তাহ ভাত – মুড়ি খাওয়া বন্ধ , শুধু দুধ – সাগু । কিন্তু খেলা ছাড়িনি । চাকরি পাওয়ার পর মানে শিপিং ছেড়ে ট্রাম কোম্পানির চাকরিতে আসার পর অফিস – ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছি । সংগ্রাম : শিপিংয়ের চাকরি ছাড়লেন কেন ? সুকুমার : ওই দুর্বিষহ জীবন যাপন আমার মােটেও সহ্য হল না । আমি ছেলেবেলায় দুরন্ত ছিলাম ঠিকই , কিন্তু বদমাইশ ছিলাম না । ওখানে যা নােংরামি … সে অনেক গল্প । এখন বলার অবকাশ নেই । আমার ‘ মেঘবিলাস ’ উপন্যাসটা পড়ে নিও , জেনে যাবে । সংগ্রাম : ও , আপনার অনেক গল্পে দুরন্তপনার বর্ণনা পেয়েছি । সেসব তাহলে কাল্পনিক নয় ! সুকুমার : না না , এসব নিজের অভিজ্ঞতা । ছেলেবেলায় ভীষণ দুরন্ত ছিলাম তাে ! পাড়ার লােকেরা তটস্থ হয়ে থাকত তাদের গাছের নারকেল , বাতাবী লেবু , পাকা পেঁপে কখন উধাও হয়ে যাবে । তবে সব অপরাধ মাফ হয়ে যেত স্কুলের পরীক্ষায় ভালাে রেজাল্ট করার জন্য । একটা ঘটনা বলি , মাধ্যমিক পরীক্ষার মাস দুয়েক আগে অসাবধানে বাতাবি লেবুগাছ থেকে পড়ে গিয়ে ডানহাত ভাঙলাম । বাবার চিন্তা — আমি পরীক্ষা দেব কী করে ? আমি কিন্তু দমবার পাত্র নই । বাঁহাতে লেখা অভ্যাস করলাম । দু’মাসে চলনসই লেখা । লেখার মােটামুটি গতি এসেছে , কিন্তু সুন্দর নয় । বুঝলাম এতে পরীক্ষা দেওয়া চলবে । তখন বােধহয় অসুস্থ পরীক্ষার্থীর সহকারী – লেখক নেওয়ার চলন ছিল না । কিংবা বাবার তা জানা ছিল না । যাই হােক , আমি বা হাতে লিখে মাধ্যমিক দিলাম । সংগ্রাম : উরিব্বাস ! আপনি তাে সব্যসাচী ! বাঁ হাতে লিখে পরীক্ষা দিলেন ! কেমন রেজাল্ট হল ? সুকুমার : রেজাল্ট মন্দ হয়নি । শুধু ইতিহাস আর বাংলার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও লিখে শেষ করতে পারিনি । বাঁ – হাতের গতি কম তাে ! ইতিহাসের জন্য দুঃখ হয়নি । কিন্তু বাংলাটার জন্য । বাংলা আমার প্রিয় সাবজেক্ট । সংগ্রাম : কিন্তু যদূর জানি , তুমি তাে ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করেছেন । সুকুমার : হ্যা , সে তাে চাকরি পাওয়ার জন্য শিক্ষাগত যােগ্যতা । কিন্তু ফিজিক্স পড়ে জ্ঞানের খিদে মিটলেও মনের খিদে মেটে না । তার জন্য বাংলা সাহিত্য পড়তে হয় । তবে আমার একটা কথা মনে হয় , বিজ্ঞান না পড়লে ভালাে সাহিত্যিক হওয়া যায় না । সংগ্রাম : আচ্ছা ! বাংলা সাহিত্যের প্রতি এত আগ্রহ আপনি কোথা থেকে বা কবে থেকে পেলেন ? সুকুমার : স্কুল – জীবন থেকে । তখন আমি বােধহয় ক্লাস সিক্সে । আমাদের বাংলা পাঠ্য বইয়ে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা একটা গল্প ছিল — ‘ আম – আঁটির ভেপু । গল্পটা খুবভালাে লেগেছিল । বাংলার স্যার বলেছিলেন , “ এটা “ পথের পাঁচালি ’ নামের এক উপন্যাসের অংশ । উপন্যাসটা পড় , ভালাে লাগবে । ‘ উপন্যাসটার খোঁজে স্কুলের লাইব্রেরিতে গেলাম । আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিটা ছিল খুবই সমৃদ্ধ । বাংলা সাহিত্যের প্রায় সমস্ত লেখকের বই সেখানে ছিল । পথের পাঁচালি ’ পেয়ে গেলাম । কয়েক ঘন্টার মধ্যে পড়ে ফেললাম । মুগ্ধ হয়ে গেলাম । মনে হল , এতে যেন আমার কথাই লেখা হয়েছে । পরের দিনে বিভূতিভূষণের অন্য বই খোঁজ করতে আবার ।
লাইব্রেরি গেলাম । কিন্তু স্কুলের নিয়ম ছিল সপ্তাহে একখানার বেশি বই দেওয়া হবে না । লাইবেরিয়ান কাকুর কাছে বই পাল্টাতে গেলে বললেন , ‘ বই না পড়েই ফেরত দিচ্ছ ! এটা পড়তে ভালাে লাগছে না ? ‘ আমি বললাম পড়েছি তাে ! খুব ভালাে লেগেছে । কাকুর তাে বিশ্বাস হচ্ছে না । বললেন , ‘ কই বল তাে দেখি ? লাইব্রেরিয়ান কাকু বইয়ের কিছু কিছু কাহিনী জিজ্ঞেস করলেন । আমি গড়গড় করে বলে গেলাম । কাকু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন , ‘ যখনই বই শেষ হবে তখনই তুমি বই পাল্টে নিয়ে যাবে । ‘ এভাবে স্কুলের লাইব্রেরিতে বিভূতিভূষণের যত বই ছিল , সব পড়ে ফেললাম । তারপর একের পর এক সাহিত্যিকের বই পড়তে লাগলাম । সংগ্রাম : লেখালেখির ক্ষেত্রে কোন কোন লেখক আপনার প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে , বা এখনাে করে ? সুকুমার : প্রথমেই বলতে হয় বিভূতিভূষণের কথা । তারপর তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় , শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রেরণা তাে জুগিয়েছেনই , পরে কিছু বিদেশী লেখকদের লেখা পড়ে প্রেরণা পেয়েছি । এখন তােমাদের মতাে লেখক – পাঠকের প্রেরণায় লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি । সংগ্রাম : আপনার লেখাগুলাের রসদ আপনি কোথায় থেকে পেয়েছেন বা এখনাে পান ? সুকুমার : মূলত আমি লেখার রসদ সংগ্রহ করি গ্রাম বাংলার সমাজ , নাগরিক জীবন ও নিবিড়ভাবে দেখা মানুষজনের কাছ থেকে । সংগ্রাম : এসব লেখায় ব্যক্তি – সুকুমার কতখানি উপস্থিত রয়েছেন ? সুকুমার : সমস্ত লেখায় যে ব্যক্তি – সুকুমার ঢুকে গেছে এমনটা নয় । তবে কিছু গল্পে ও প্রথম উপন্যাসে ব্যক্তি আমি প্রবলভাবে উপস্থিত । সংগ্রাম ; কোন লেখাটায় লেখকের উপস্থিতি বেশি ? সুকুমার : প্রথম উপন্যাস ‘ মেঘবিলাস ’ তাে নিজের কিশােরবেলা ও যৌবনকাল নিয়েই । সংগ্রাম ; এ উপন্যাসটা কবে কোন পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে ? সুকুমার : এটা ২০০৬ – এ ‘ পূজাবার্ষিকী আনন্দলােক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । ২০০৮ – এ ‘ পূজাবার্ষিকী আনন্দলােক ’ – এ বেরােয় ‘ বিষাদবিলাস ’ উপন্যাসটা । ওই দুটো উপন্যাস নিয়ে একসঙ্গে ২০০৯ – এ আনন্দ পাবলিশার্স ‘ মেঘবিলাস ’ নামে বই আকারে বের করেছে । সংগ্রাম ; আর কবিতা বা গল্প কবে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ? কোন্ পত্রিকায় ? সুকুমার : প্রথমে লিটল ম্যাগাজিনে আমার কবিতা প্রকাশ হয় । সেটা ১৯৯৫ সাল । পত্রিকার নাম ছিল ‘ চোখ । তারপর বিভিন্ন বানিজ্যিক ও অবানিজ্যিক পত্রিকায় কবিতা বেরােতে থাকে । আমি প্রথম গল্প লিখি ১৯৯৮ সালে । ওই বছরেই গল্পটি ‘ জোয়ার নামে এক ছােট পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । বাণিজ্যিক পত্রিকা ‘ দেশ ’ – এ আমার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে । ২০০৬ – এ ‘ আনন্দ ’ আমার গল্প সংকলন ‘ দোয়েলের শিস বের করে । তারপর তাে বছর দশেক ধরে গল্প উপন্যাস লিখে চলেছি । সব মিলিয়ে নামী প্রকাশনের গােটা কুড়ি বই বাজারে চলছে । সংগ্রাম ; তার মধ্যে আপনার ইংরাজি বই , মানে নভেলও তাে আছে । বিজ্ঞাপন দেখি তাে ! একটা ইংরাজি গল্প বইয়ের বিজ্ঞাপনও দেখেছিলাম যেন ! সুকুমার : নভেল আছে । নভেল মানে বাংলা উপন্যাসের অনুবাদ । আমার কয়েকটি উপন্যাস ইংরিজিতে অনুদি হয়েছে । মেসিন এজ ডট কম ’ উপন্যাসটা ইংরিজি ছাড়া অসমিয়া ও ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে । দশটা ইংরাজি গল্প নিয়ে একটা বই করছে ফ্লাইং টার্টল পাবলিকেশন । সংগ্রাম : বাঃ ! তার মানে অন্য ভাষাভাষির পাঠকও আপনার লেখা পড়ার সুযােগ পাচ্ছে । অর্থাৎ আপনাকে এখন প্রাদেশিক লেখক না বলে জাতীয় স্তরের সাহিত্যিক বলা যেতে পারে । সুকুমার : হাঃ হাঃ হাঃ ! কী বলা যেতে পারে না পারে , তােমরা ভাববে । আমার লেখার কথা লিখে যাচ্ছি । !

সংগ্রাম : লিখে তাে যাচ্ছেন , একটা কথা জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছে –সাহিত্যিক হিসেবে আপনি স্বীকৃতি মানে সম্মাননা , পুরস্কার কী কী পেয়েছেন ? সুকুমার : ভাই , এই যে তুমি আমার সাক্ষাৎকার নিতে এত দূর থেকে ছুটে এসেছ , এটাই তাে আমার পুরস্কার । পাঠকের মনে জায়গা পাওয়াটাই তাে লেখকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার । সংগ্রাম : সে তাে নিশ্চয় ! আমি বলছি কোনাে সরকারি পুরস্কার কিংবা — সুকুমার : না ভাই , এখনাে পর্যন্ত কোনও সরকারি পুরস্কার আমি পাইনি । তবে বিভিন্ন বেসরকারি সাহিত্য – সংস্কৃতি সংস্থা থেকে অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছি । যেমন ‘ দেশ ’ পত্রিকা থেকে দু’বার প্রশংসিত গল্পকার সম্মানপত্র পেয়েছি । ২০০৪ ও ২০০৭ – এ অসমের ডিব্ৰুগড় থেকে পেয়েছি বসুন্ধরা সাহিত্য পুরস্কার ২০০২ – এ । বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন থেকে পেয়েছি “ ইন্দুবালা বিশ্বাস স্মৃতি পুরস্কার ২০০২। “ উত্তরকথা ’ নামের নির্বাচিত গল্প সংকলনের জন্য অসমের গুয়াহাটি থেকে পেয়েছি ‘ শুভম বুকস্ সাহিত্য পুরস্কার’২০১৪ তে । ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস্ কনভেনর অফ ইন্ডিয়া থেকে হিউম্যান রাইটস্ শান্তি পুরস্কার পেয়েছি এইবছরেই ২০১৬ – তে । এবছর ‘ চোখ সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার চিঠি পেয়েছি । ১৮ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি – তে দেওয়া হবে । এছাড়া সাহিত্যবাণী পুরস্কার , চৌরঙ্গীনাথ পুরস্কার , সােনালি গল্প পুরস্কার , ড্রিম অ্যাওয়ার্ড , লহমা সাহিত্য পুরস্কার এরকম গােটা পঁচিশেক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছি । তবে কী জান , এসব পুরস্কার পাওয়া না – পাওয়াতে সাহিত্যিকের বিচার হয় । সময়ই বিচার করে কোন সাহিত্যিক বেঁচে থাকবে আর কোন্ সাহিত্যিক কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে । ভালাে লিখে যাওয়াটাই শেষ কথা । সংগ্রাম : তা ঠিক । আচ্ছা , সুকুমারদা ’ , বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুনদের মধ্যে ভালাে লিখছে , এমন কয়েজনের নাম বলুন না ! মানে যাদের লেখা আপনাকে প্রাণিত করে । সুকুমার : প্রথিতযশাদের লেখা তাে আমাকে প্রাণিত করেই । তবে বেশ কিছু অপ্রতিষ্ঠিত লেখক – এর গল্প – উপন্যাস আমার খুব ভালাে লাগে । তারা বেশিরভাগই মফস্বলের বলা ভালাে গ্রামবাংলার । তাদের কয়েকজন হলেন বাঁকুড়ার সােনামুখীর সায়ন্তন মুখােপাধ্যায় , হুগলির হরিপুরের দেবাশিস মল্লিক , বর্ধমান জেলার কাটোয়ার তাপস হাজরা , মহিষাদলের সৌরভ কুমার ভুইয়া , বর্ধমান জেলার রূপনারায়ণপুরের কল্যাণ ভট্টাচার্য । এরকম অনেক নতুন লেখক খুব ভালাে লিখছেন । কিন্তু এঁরা সেভাবে প্রচার পাচ্ছেন না । কলকাতায় থাকলে এঁরা হয়তাে কিছুটা প্রচারের সুবিধা পেতেন । আর কবিদের কথা তাে বলাই বাহুল্য । গ্রামে – গঞ্জে মফস্বলের অনেক কবি অসাধারণ কবিতা লিখছেন । পড়ছি , মুগ্ধ হচ্ছি । তুমিও খুব ভালাে কবিতা লেখাে । সংগ্রাম : হাঃ হাঃ হাঃ ! আমার নামটা কি ভদ্রতা করে ? সুকুমার : তা কেন হবে । এখন তুমি সাক্ষাৎকার নিতে এলেও আসলে তুমি তাে একজন কবি । তােমার কবিতা পড়েছি । যথেষ্ট ভালাে লেখাে তুমি । সংগ্রাম : বুঝেছি । আচ্ছা , গ্রাম – বাংলার লেখকদের কথা তাে বললেন । এবার একটু বৃহত্তর বাংলার দিকে যাব । জানতে চাইব বাংলাদেশের কবিতা – গল্প – উপন্যাস সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী ? সুকুমার : সত্যি কথা বলতে কি বাংলাদেশের সাহিত্য আমার খুব বেশী পড়া হয়ে ওঠেনি । যা পড়েছি তাতে আমার মনে হয় , এখানকার চেয়ে বাংলাদেশের কবিতা – গল্প – উপন্যাসে অনেক বেশি মাটির গন্ধ , অনেক বেশি প্রাণবন্ত । বাংলাদেশের গল্প উপন্যাসে সত্যিকারের গল্প থাকে । শুধুমাত্র নির্মিতির কারিকুরি ও পান্ডিত্য ফলানাে থাকে না । ওখানকার উপন্যাস পড়লে বাঙালি জনজীবনকে আরও নিবিড়ভাবে জানা যায় বলে আমার মনে হয় । সংগ্রাম : বাংলাদেশের কার কার লেখা ভালাে লাগে ?
সুকুমার : কার কার লেখা ভাল লাগে এটা বলা মুশকিল একারণেই যে , বাংলাদেশের খুব বেশি লেখক – কবির বই আমি পড়িনি । কবির মধ্যে সামসুর রাহমান , নির্মলেন্দু গুণ , আল মাহমুদ এরকম কয়েকজনের কবিতা পড়েছি । গল্প – উপন্যাসও হাতে গােনা কয়েকজনের । যেমন , আখতারুজ্জামান ইলিয়াস , হুমায়ুন আহমেদ , সৈয়দ সামসুল হক , সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ , ইমদাদুল হক মিলন , নাসরিন জাহান এরকম কয়েকজনের লেখা পড়েছি । খুবই ভালাে লেগেছে । আসলে ওখানকার বেশি লেখকের বই এখানে পাওয়া যায় না । সংগ্রাম : একটু অন্য কথায় আসি । বলছি যে , দুই বাংলার সাহিত্যের সম্মিলন কীভাবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন ? সুকুমার : দুই বাংলার মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্মেলন তাে হচ্ছেই । এখানকার প্রকাশকরা ওখানকার বইমেলায় বা ওখানকরা প্রকাশকরা এখানকার বইমেলায় অংশগ্রহণ করছে । বইমেলা ছাড়াও আকাদেমি চত্বরে বা অন্যান্য জায়গায় নানা বইবাজার হয় । সেখানে দুদেশের বইয়ের আদান প্রদান হয় । এছাড়া আরেকটা উপায় হতে পারে , সেটা হল যৌথ প্রচেষ্টা । ওখানকার ও এখানকার প্রকাশক সম্মিলিত হয়ে দু’দেশেই একই বই প্রকাশ করলে সে বইয়ের বিক্রি বাড়বে । পরিচিত প্রকাশক হওয়ার জন্য দুদেশের পাঠকই বইটা কিনতে আগ্রহ দেখাবে । তবে বইয়ের দাম অবশ্যই বাংলাদেশের চেয়ে এখানে কম হতে হবে । সংগ্রাম : আচ্ছা এ ব্যাপারে লিটল ম্যাগাজিনের কোনও ভূমিকা আছে বলে আপনি মনে করেন ? সুকুমার : অবশ্যই আছে । যে কোনও লেখক তাে লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমেই পাঠকের কাছে পরিচিত হয় , এমনকি বড় পত্রিকার সম্পাদকের কাছে পরিচিত হয় । একটু পরিচিতি পেলে বড় কাগজে স্থান পায় । আমার কথাই ধর না ! আমি তাে লিটল ম্যাগাজিনেই লেখা শুরু করেছি । অনেকদিন পর বড় কাগজে জায়গা পেয়েছি । তারপর বহু বছর ধরে বড় কাগজে লিখছি , কিন্তু সেই সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনেও লিখে চলেছি । এর একটা প্রভাব তাে পাঠকমনে পড়েই । তাছাড়া লিটল ম্যাগাজিনগুলােতে দুই দেশের লেখক কবিরা স্থান পায় । দুই বাংলার মধ্যে পত্রিকা বিনিময় হয় । তাই দু’বাংলার সাহিত্যের মিলনের ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অপরিসীম । সংগ্রাম : আচ্ছা সুকুমারদা , সাহিত্য প্রসারে ব্লগ , অনলাইন পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিনগুলাে কতখানি ভূমিকা পালন করছে বলে আপনি মনে করেন ? সুকুমার : ব্লগ বা অনলাইন পত্রিকার ভূমিকাও কম নয় । বরং বেশি বলা যায় । এতে আদান – প্রদানের গতি বেড়েছে । এখান থেকে একটা কাগজের পত্রিকা বাংলাদেশে পাঠাতে যথেষ্ট সময় এবং অর্থ ব্যয় হয় । কিন্তু অনলাইন পত্রিকা ওয়েবসাইটে আপলােড করার সঙ্গেসঙ্গেই বিশ্বশুদ্ধ পাঠক পেয়ে যায় । পেতে খরচও কম । এছাড়া ব্লগ কিংবা সােশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটগুলােতে ছােট আয়তনের লেখা পােস্ট করার মধ্যে দিয়ে অসংখ্য পাঠকের কাছে নিমেষে লেখাটা পৌঁছে দেওয়া যায় বিজ্ঞানের ও আধুনিক কারিগরির অবদান । সেটা শুধু সাহিত্য কেন সবকিছু প্রসারের জন্যে বড় ভূমিকা নেয় বলে আমার মনে হয় । সংগ্রাম : এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ । সুকুমার : তােমাকেও ধন্যবাদ ভাই , ভালাে থেকো ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here