মুজিবনগর প্রতিনিধি।।
মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর মাঝপাড়া গ্রামের যুবক শরিফুল ইসলাম হত্যার প্রায় ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিচার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তার পরিবার ও স্থানীয়রা। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশ্যে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২৪ বছর বয়সী শরিফুল ইসলাম ছাত্রদলের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল ব্যক্তি তাকে প্রকাশ্যে মারধর করে হত্যা করে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা অন্য একটি ঘটনায় গুরুতর আহত হন একই গ্রামের মঞ্জুর আলী। হামলাকারীরা তাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়।

তবে প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি বর্তমানে মারাত্মক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

মঞ্জুর আলী বলেন, ঘটনার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আদালতে মামলা করলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে মামলা চালাতে পারেননি। দুই কন্যা সন্তান নিয়ে পঙ্গুত্বের মধ্যেই সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেন। এছাড়া একই সময়ে মিঠু নামের আরেক ব্যক্তিকে গুমের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘটনার দিন শরিফুল ইসলাম বাড়ির অদূরে একটি পুকুরপাড়ের চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল ব্যক্তি সেখানে গিয়ে তাকে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি বাড়ির দিকে চলে গেলে বাড়ির পাশেই কুলসুম নামের এক নারীর বাড়ির সামনে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

মামলার এজাহার ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় বাবু দফাদার, জাহাঙ্গীর, আসলাম, মজিবারসহ আরও কয়েকজন জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী কুলসুম বলেন, হত্যাকাণ্ডটি তার সামনেই সংঘটিত হয়েছিল। তিনি বলেন, রাস্তার দিক থেকে শরিফুলকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে নিকিরি নামের গোষ্ঠীর লোকজন। তার উঠানে এসে প্রতিপক্ষের আঘাতে শরিফুল পড়ে যায়।

তিনি (কুলসুম) ঘরের মধ্যে ছিলেন, বাইরে এসে দেখেন অনবরত পেটানো হচ্ছে ছাগল, লোহার রড ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কয়েকজন মিলে। তাৎক্ষণিক তিনি তাদের মারতে নিষেধ করলেও তার কথায় কেউ ভ্রুক্ষেপ করেনি; বরং অনবরত পেটাতে থাকে। তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর আগে মানুষ সাধারণত যে ঝাঁকুনি দেয়, সেরকম ঝাঁকনি তিনি দেখতে পান শরিফুলের ঘাড় ও মাথায়। আদালতেও তিনি এই ঘটনার বীভৎস চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর থানায় মামলা গ্রহণ না করায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। প্রথম বাদী ছিলেন নিহত শরিফুলের ভাই তয়ব আলী। তার মৃত্যুর পর বর্তমানে মামলার বাদী হিসেবে রয়েছেন তার ছেলে হাসান। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মামলাটি চলমান থাকলেও এখনো চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হয়নি।

স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও পরবর্তীতে আবার এলাকায় ফিরে এসে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বর্তমানে মামলার অভিযুক্তরা জামিনে রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এলাকায় ফিরে এসে তারা তাদের পূর্বের অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর সেখান থেকে ৭/৬/২০২৬ তারিখে শরিফুলের চাচাতো ভাই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আলমগীরকে কোপ মারার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে গ্রামবাসীসহ স্থানীয়রা তাদের ওপর চড়াও হলে তারা পালিয়ে যায় এবং ১০ তারিখে উল্টো শরিফুলের চাচাতো ভাইদের নামেই কোর্টে মামলা দায়ের করে হত্যাকারী বাবু দফাদার গং।

নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করে দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তাদের মতে, এ ধরনের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও বৃদ্ধি পাবে।