আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ন নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাত যে জটিল রূপ ধারণ করেছে, তা পুরো জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী রবিবার শেষ হতে চলায় এই সংকট এখন চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছেছে। চুক্তি অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা থাকলেও স্বাক্ষর করার পরপরই পারস্য উপসাগরে একে অপরের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে শুরু করে উভয় পক্ষ। চুক্তির মেয়াদ ফুরানোর মুখে যুদ্ধের পথ বন্ধ করতে ও কৌশলগত জলপথ চালুর লক্ষ্যে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি তেহরানে জরুরি সফর করে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও সমাধান মেলেনি।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই রুটটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক বাকযুদ্ধ চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক এই জলপথটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর এবং বাসিজ আধা-সামরিক বাহিনীর প্রধান হোসেইন তায়েব মার্কিন দাবিকে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই জলপথের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই রয়েছে এবং ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের ধরন কেবল সরাসরি সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গভীর এক অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ‘রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’-এর গবেষক মাইকেল স্টিফেনসের মতে, পর্দার অন্তরালে ওমান এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে নৌ-চলাচল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে ইরান। আঞ্চলিক প্রতিবেশী ও জিসিসি রাষ্ট্রগুলোও এক প্রকার বাধ্য হয়ে হরমুজের এই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে। তেলের বৈশ্বিক বিকল্প রুট নির্মাণের কথা মার্কিন প্রশাসন বললেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। ফলে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি এই প্রণালিকে অবরোধ করে ওয়াশিংটনের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দরকষাকষির মূল চাবিকাঠি এখন তেহরানের হাতে।
ইরানি নীতিনির্ধারকদের হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা বিশ্বাস করেন যে, বর্তমানের অর্থনৈতিক চাপ তাদের সরকারের অস্তিত্বের জন্য কোনো হুমকি নয়। গত ফেব্রুয়ারির শেষে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সূচনালগ্নে তেহরান সরকার ভেঙে পড়বে বলে যে জল্পনা ছিল, তা এখন পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই ইরানে সরাসরি স্থল অভিযান চালাতে পারবে না, এমন নিশ্চিত বার্তা পেয়ে তেহরান এখন লড়াই দীর্ঘায়িত করার কৌশল বেছে নিয়েছে। তারা জানে যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তীব্রতর হবে।
এই চরম অচলাবস্থার মাঝেই একে অপরকে দোষারোপের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওয়াশিংটনের নীতিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ভুল এবং ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত ভুল করে চলেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে নিয়ে হরমুজ ইস্যুতে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই বড় ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশের ফসল। অন্যদিকে সংঘাত থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ না পেয়ে এবং পরাজয় স্বীকার না করার মানসিকতা থেকে মার্কিন প্রশাসন ভিন্ন ছক কষছে বলে মনে করেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সদস্য ও বিমান বাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আঞ্চলিক মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমিয়ে সর্বনিম্ন স্তরে আনা ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দিনগুলোতে ইরানের অভ্যন্তরে বড় ধরনের কোনো সামরিক হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই বর্তমানে এমন এক বন্দিদশায় আটকে গেছে যেখানে যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল কারোরই অনুকূলে যাওয়া অসম্ভব।
পারস্য উপসাগরের এই বিশাল সংকটের রেশ ছড়িয়ে পড়ছে সংলগ্ন অন্যান্য অঞ্চল ও ভূ-রাজনীতিতেও। ইয়েমেনের ভেতরে হুথি বিদ্রোহী এবং সরকারের অনুগত সামরিক বাহিনীর মধ্যে সহিংসতা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাইজ ও আল-মাখা অঞ্চলে হুথিদের উপর্যুপরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নস্যাৎ করতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ইয়েমেনি সেনাবাহিনী। পাশাপাশি, ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান ও বেলুচিস্তান সীমান্তে নাশকতার বড় পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দুই মার্কিন ও ইসরায়েলি এজেন্টকে হত্যা করার দাবি করেছে দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়।
লড়াইয়ের এই অশুভ ছায়ার মাঝে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে গেছে ওমান উপকূলে। ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামের একটি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিতর্কিত তেলবাহী ট্যাংকার থেকে অনবরত নির্গত তেল ওমানের সমুদ্র উপকূলে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তেলের আস্তরণ সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, যা ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষের এই সন্ধিক্ষণে বিশ্ব এক চরম স্থবিরতা পর্যবেক্ষণ করছে। হরমুজ প্রণালিকে সচল করার বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, আটকে থাকা ইরানি তহবিল মুক্ত করা এবং সামরিক অভিযান চিরতরে বন্ধ করার মতো ছয় দফা কঠিন শর্ত তুলে ধরেছে তেহরান। বিপরীত দিকে ক্ষমতার প্রদর্শন এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় ওয়াশিংটন। কূটনৈতিক সমঝোতা নাকি এক অনিশ্চিত ও ধ্বংসাত্মক বৃহত্তর সংঘাত কোন পথে মোড় নেবে মধ্যপ্রাচ্য, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।