খুলনা সংবাদদাতা।।
খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংসের রং লাল থেকে নীলচে-সবুজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ জানতে পেরেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তাদের ধারণা, রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষিত ঠান্ডা মাংস রান্নার আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় না এনে হঠাৎ অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে এলে মাংসের লাল রং তৈরির উপাদান মায়োগ্লোবিনে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে মাংসের রং সবুজ হয়ে যেতে পারে।
তবে পরীক্ষায় ওই মাংসে কোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা রং তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। মাংসে পচা গন্ধ বা আঠালো ভাবও ছিল না। ফলে মাংস পচে যাওয়া কিংবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে রং পরিবর্তন হয়নি বলে পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্যবিশ্লেষণ শাখার ২৭ আগস্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। পাইকগাছায় রান্নার পর সবুজ হয়ে যাওয়া মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে নমুনাগুলো পরীক্ষা করা হয়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খুলনা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান বলেন, গরুর মাংসের লালচে রঙের জন্য দায়ী উপাদান হলো মায়োগ্লোবিন। ফ্রিজে সংরক্ষিত ঠান্ডা মাংস হঠাৎ করে বেশি তাপের সংস্পর্শে এলে ওই উপাদানে পরিবর্তন ঘটতে পারে। তখন মাংসের লাল রং সবুজ হয়ে যেতে পারে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২২ জুলাই। ওইদিন পাইকগাছা পৌর এলাকার মডার্ন বেকারির ২৫ কর্মচারী পিকনিকের আয়োজন করেন। সকালে তাঁরা পাইকগাছা বাজারের মাংস বিক্রেতা ইসমাইলের দোকান থেকে আগের দিন জবাই করা এবং রেফ্রিজারেটরে রাখা চার কেজি গরুর মাংস কেনেন।
রান্না শুরুর কিছুক্ষণ পর মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং পরিবর্তিত হয়ে নীলচে-সবুজ হতে শুরু করে। পরে রং আরও গাঢ় হয়ে যায়। বিষয়টি দেখে বেকারির কর্মচারীরা রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে প্রথমে মাংস বিক্রেতার দোকানে যান। এরপর তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ও থানায় বিষয়টি জানান। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা হয়।
ঘটনার পর পাইকগাছা উপজেলা মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (স্যানিটারি ইন্সপেক্টর) উদয় কুমার মণ্ডল রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে মাংস বিক্রেতার রেফ্রিজারেটরে থাকা প্রায় ৬০০ গ্রাম কাঁচা মাংসও সংগ্রহ করা হয়। ২৪ জুলাই কাঁচা ও রান্না করা মাংসের দুই ধরনের নমুনা খুলনা জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রোববার পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খুলনা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান। তিনি জানান, পরীক্ষার ফলাফলে ধারণা করা হয়েছে, ফ্রিজে সংরক্ষিত মাংস রান্নার আগে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ভালোভাবে না এনে অতিরিক্ত গরম তেলে দেওয়ার কারণে মাংসের লাল রং তৈরির উপাদান সরাসরি বেশি তাপের সংস্পর্শে আসে। এতে ওই উপাদানে পরিবর্তন ঘটে মাংসের রং লাল থেকে সবুজ হয়ে থাকতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্যবিশ্লেষক নাজিয়া সুলতানার স্বাক্ষরিত পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাংসের নমুনায় কোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা রং তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া মাংসে পচা গন্ধ কিংবা আঠালো ভাবও ছিল না। তাই মাংস পচে যাওয়া বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে রং পরিবর্তন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোকলেছুর রহমান বলেন, পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘ধারণা করা হচ্ছে’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, এ ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা করা হয়। তাই সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত কারণ হিসেবে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে মাংস বিক্রেতা ইসমাইল শুরু থেকেই মাংসে কোনো সমস্যা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তাঁর দাবি, একই মাংস থেকে আরও কয়েকজন ক্রেতার কাছে মাংস বিক্রি করা হয়েছিল। শুধু মডার্ন বেকারির কর্মচারীরাই অভিযোগ করেছিলেন।
মডার্ন বেকারির কর্মচারী লিটন হোসেন বলেন, ‘আমরা ওই মাংস খাইনি। প্রশাসনকে জানিয়ে ফিরে এসে মাংস ফেলে দিয়েছিলাম। এখন পরীক্ষার ফল পাওয়া গেছে। ওই মাংসে নাকি ক্ষতিকর কিছু ছিল না। ফলাফল জানতে পেরে ভালো লাগছে। কিন্তু মাংস তো কেউ খেতেই পারিনি।’