বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া এখন আর দূরের কোনো বিষয় নয়। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনীতির সমীকরণ প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে? আর যুক্ত হলে বাংলাদেশের লাভ কী, আর না হলে সম্ভাব্য ক্ষতিটাই বা কোথায়?

আমার দৃষ্টিতে, বিষয়টি কোনো আবেগ দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—তিনটি দেশেরই নিজস্ব শক্তি ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব, তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা—এই তিন দেশের সমন্বিত সহযোগিতা বাংলাদেশের সামনে কিছু নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ, ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে একটি দেশের নিরাপত্তা শুধু স্থলসীমান্ত বা অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, আকাশসীমা ও সমুদ্র নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে তুরস্কের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। সৌদি আরবে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে রিয়াদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অতীতের ইতিহাস বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাসকে সম্মান করেও বর্তমান ও ভবিষ্যতের জাতীয় স্বার্থে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে স্থায়ী জাতীয় স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় কিছু প্রশ্নও রয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—আমরা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সীমান্ত ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশ যুক্ত হলে ভারত সেটিকে কীভাবে দেখবে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়াও কোনো সমাধান নয়।

এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা।

বাংলাদেশকে এমন কোনো অবস্থানে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্ক—প্রত্যেকের সঙ্গেই বাংলাদেশের আলাদা আলাদা স্বার্থ ও প্রয়োজন রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ যদি কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়, ভবিষ্যতে সেই জোটের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের দায়িত্ব বর্তাবে?

বন্ধুত্ব এক জিনিস, আর সামরিক বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বাংলাদেশের উচিত হবে কোনো চুক্তিতে যাওয়ার আগে প্রতিটি ধারা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। বিশেষ করে যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও দেশের নিজস্ব নীতির সঙ্গে চুক্তিটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে সরাসরি সামরিক বাধ্যবাধকতার আগে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো।

বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিতে পারে, যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারে, সাইবার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা করতে পারে, প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলা উচিত, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো জোটে যোগ দেওয়াই শক্তির একমাত্র পরিচয় নয়।

নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কূটনৈতিক সম্পর্ক বিস্তৃত করা এবং প্রয়োজনের সময় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বৈরিতা নয়। এই নীতি অনুসরণ করেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা সম্ভব। একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।

তাই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-তে দেওয়া ঠিক হবে না।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

বাংলাদেশ কী পাবে?
বাংলাদেশ কী হারাতে পারে?
কী ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে?

যদি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং একই সঙ্গে দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে উদ্যোগটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

অন্যদিকে যদি এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিংবা ভবিষ্যতে এমন কোনো সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি জাতীয় স্বার্থ নেই, তাহলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত তাই কোনো দেশকে খুশি করার জন্য হওয়া উচিত নয়। আবার কোনো দেশকে অসন্তুষ্ট করার ভয়েও হওয়া উচিত নয়।

সিদ্ধান্ত হতে হবে শুধু বাংলাদেশের জন্য।

আমরা সৌদি আরবের বন্ধু হতে পারি, তুরস্কের বন্ধু হতে পারি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারি। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারি, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি।

কারণ একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি যদি শুধু ‘কার সঙ্গে আছি’—এই প্রশ্নে আটকে যায়, তাহলে ‘কেন আছি’ এবং ‘দেশের কী লাভ’—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক কূটনীতি, যেখানে আবেগ থাকবে না—এমন নয়; বরং আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বড় হবে। বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে। সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিনিময়ে নয়।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ হতে পারে, আবার ভুল সিদ্ধান্ত হলে এটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠতে পারে।

তাই দরজা বন্ধ নয়, আবার চোখ বন্ধ করেও নয়।

প্রথমে চুক্তি বুঝতে হবে।
তারপর জাতীয় স্বার্থের হিসাব করতে হবে।
এরপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শেষ কথা একটাই—

বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে জোটে যাবে না; বাংলাদেশ যাবে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে।
বাংলাদেশ কারও ছায়া হবে না; বাংলাদেশ হবে নিজের স্বার্থে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র।

আজকের পৃথিবীতে সেটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক-মোঃ আব্দুর রহমান অনিক
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক পদ্মা সংবাদ