মিতা রহমান।।
হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমাজের নারী সমাজের ওপর বহুমুখী ও গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও বেশি কষ্টকর করে তুলছে। আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা সাধারণত গৃহস্থালি পরিচালনা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র—সকল জায়গাই সামলাতে হয়। তাই তেলের মূল্য বৃদ্ধি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে নারীদের ওপরই।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবনে। চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সোমবার সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে অনেক। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজারে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। নতুন মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক রাতের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় গণপরিবহন চালকরা বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনের ভাড়া। সেই প্রভাব পড়েছে রাস্তায় থাকা গণপরিবহন থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার হয়ে রং এবং হার্ডওয়্যার সরঞ্জামের বাজারেও। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে থেকে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন।
নারীর সংসার পরিচালনায় ব্যয়বৃদ্ধি পায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং কাঁচাবাজারের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। ফলে চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে। সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালাতে গিয়ে নারীদের তীব্র মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। কর্মজীবী নারী এবং ছাত্রীদের যাতায়াত খরচ একলাফে এতটাই বৃদ্ধি পায় যে সামাল দিতে নানা সমদস্যার সম্মুক্ষিন হতে হয়। খরচ বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় তারা তুলনামূলক কম নিরাপদ বা অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হন, যা তাদের নিরাপত্তা ও স্বস্তিকে বিঘ্নিত করে।
জ্বালানি তেলের সাথে সাথে এলপিজি গ্যাস, কেরোসিন বা অন্যান্য জ্বালানির দামও বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ ও শহরতলীর অনেক নারী যারা কেরোসিন বা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের রান্নার বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। পরিবারের খরচ বেড়ে গেলে অনেক সময় নারীরা নিজেদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ওপর বাজেট কমিয়ে দেন। সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে অনেক নারী নিজের খাবার বা চিকিৎসা খরচ কমিয়ে দেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তা, বিশেষ করে যারা অনলাইন ব্যবসা বা বুটিকের সাথে জড়িত, পণ্যের ডেলিভারি খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক মুনাফা কমে যায়। অনেক সময় বাড়তি খরচের কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির মূল্য কম ছিল, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মূল্য না কমিয়ে লাভবান হয়েছে। এর ওপর আবার একলাফে ৫০ শতাংশ দাম বাড়িয়ে তার বিপরীতে লিটারে মাত্র পাঁচ টাকা কমানো হলো কিছুদিন আগেই মাত্র। এতে যাদের ওপর প্রভাব পড়েছিল, তাদের জন্য এই ঘোষণা সত্যিকার অর্থে উপহাস। কারণ বাংলাদেশে যেকোনো কিছুর মূল্য একবার বেড়ে গেলে সেটা কমার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।
জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্যের কারণে পরিবহন খরচে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে আরো কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দামে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। বিক্রেতারা বলছেন, আজকের বাজারে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশ আগেই পরিবহন করে বাজারে আনা হয়েছে। ফলে নতুন জ্বালানি দরে পরিবহন খরচের হিসাব এখনো পুরোপুরি যুক্ত হয়নি। কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা বাবর উদ্দিন বলেন, আগামী দুয়েকদিনে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা দামও বাড়াতে হবে। পরিবহনের ভাড়া বাড়বে নিশ্চিত, আর আমাদের বেশি দামে কিনতে হলে বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে, সেখানে বলার কিছু নাই। কিন্তু, এভাবে চলবে কিভাবে ? সরকার কি সাধারণ মানুষের কথা একবারও ভাববে না।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি নারী সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানসিক শান্তি এবং জীবনযাত্রার মানকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে নারীরাই সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করেন। তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং যাতায়াত খরচ বেড়ে যায়, যা নারীদের নিজস্ব জমানো টাকা বা জরুরি তহবিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশি। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে। বাসভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি, চাল বা সবজির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক—তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতিতে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার এসব সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারছে না। মুক্তবাজারের নিষ্ঠুর কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্র আবারও চাপিয়ে দিল এক চরম জুলুমের বোঝা। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে কৃষি ও গণপরিবহনের চালিকাশক্তি ডিজেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়, যা সরাসরি সেচ ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে প্রান্তিক কৃষককে খাদের কিনারায় ঠেলে দেবে। অন্যদিকে পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ এবং গ্রামীণ মেহনতি মানুষের আলোর উৎস কেরোসিনের দাম ১৪.৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করায় তাদের জীবনে তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে।
যাতায়াত খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক চাকরিজীবী নারীর যাতায়াত ভাতা বেতনের বড় অংশ খেয়ে ফেলে। ফলে কম বা মাঝারি বেতনের চাকরি করা নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করা অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। নিত্যদিনের পারিবারিক ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাওয়ার ফলে নারীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হয়। এটি পরিবারে অশান্তি ও মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়। খরচ বাঁচাতে অনেক নারী নিজস্ব বা নিরাপদ গণপরিবহন ছেড়ে অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত বা অনিরাপদ গণপরিবহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। এটি তাদের প্রতিদিনের মানসিক উৎকণ্ঠা ও শারীরিক ক্লান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সমাজে মূল্যস্ফীতির যে চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া তৈরি হয়, তার চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রভাবটি পড়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর।
( লেখক : কবি ও রাজনীতিক, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ, আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন)