শিমুল রেজা।।
কৃষকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা–২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কৃষকদের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই সংশোধিত নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। একজন ব্যক্তি একাধিক সার ডিলারশিপের মালিক হতে পারবেন না। ডিলারদের নিজস্ব গুদাম, গোডাউন এবং সার বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভিস সেন্টার থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সরকার কৃষকদের হাতের নাগালে সার পৌছে দেয়ার জন্য ইউনিয়ন ভিত্তিক বিসিআইসি ও বিএডিসি সার ডিলারদের সার বিতরণসহ কৃষকদের স্বার্থে সার ও কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু সরবরাহ জন্য কৃষকদের মাঝে কৃষক কার্ড বিতরণ, উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি উপসহকারীদের মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে যখন সরকার কাজ করছে। ঠিক তখন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অদৃশ্য ক্ষমতায় পরিচালনা করছে অবৈধ ভাবে নীতিমালা বিহীন একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে নিয়মবহির্ভূত ভাবে সারের ডিলার পরিচালনা করে আসছে। জীবননগর বাজারের হাজী তবিবর রহমান।
প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স তবিবর রহমান ও মেসার্স সোহেল ট্রেডাস, তিনি একই নামে বিসিআইসি ও বিএডিসি সার ডিলারশিপ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় নিজের নামে স্ত্রীসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে সার ডিলারশিপ লাইসেন্স নিয়েছেন। একইভাবে নানা অনিয়মে ভুয়া ঠিকানা ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ডিলারশিপ নিয়েছেন। অনিয়মে সরাসরি যুক্ত থাকা সত্ত্বেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার একাধিক অসাধু সারের ডিলার। কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা, বিএডিসির অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের যোগসাজশে নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই চলছে এই অনিয়ম। নির্ধারিত বরাদ্দের পাশাপাশি অন্যান্য ডিলারের সার তুলে বিভিন্ন স্থানে বেশি দামে বিক্রয় করে দিচ্ছে এই চক্রটি। ফলে প্রতি মৌসুমে শুরুতেই গত জুলাই মাসে চুয়াডাঙ্গায় সারের তীব্র কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে পড়ে চড়া দামে সার কিনতে হয়।

বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারশিপ একই পরিবারের একাধিক লাইসেন্স প্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন–জীবননগর পৌরসভা বাজারের মেসার্স সোহেল ট্রেডাস, তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স তবিবর রহমান। চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মোসাবুল ইসলাম লিটনের নামে দুইটা একটা প্রতিষ্ঠান জীবননগর পৌর শহরের দত্তনগর রোডে মেসার্স মোল্লা ট্রেডাস এবং
জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের গোয়াল পাড়া বাজারে মেসার্স মোল্লা ট্রেডাস, উথলী ইউনিয়নের জহির উদ্দিন ও তার স্ত্রী নাসিমা খাতুন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স জহির ট্রেডার্স।
আন্দুলবাড়ীয়া বাজারের আব্দুল খালেক ও তার ছেলে শরিফুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স ভাই ভাই বীজ ভান্ডার। বাকা ইউনিয়নের ও আন্দুলবাড়ীয়া একাংশ,মিজানুর রহমান, তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স মিজানুর রহমান। রায়পুর ইউনিয়নের হাসাদহ বাজারের মীর ইসমাইল হোসেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স রাসেল এন্টারপ্রাইজ।আন্দুলবাড়ীয়া বাজার ও (ইউনিয়নের একাংশ)খন্দকার মো: নাজমুস সালাম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স এম এস এন্টারপ্রাইজ।

বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মধ্যে গত আগস্ট মাসে সার সরবরাহ ও বণ্টন নিয়ে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অনিয়মের অভিযোগে জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে সার ডিলারদের সার বিতরণ, কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু সরবরাহ, কৃষক কার্ড বিতরণ মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটে। কৃষকের অভিযোগ নিজের নামে ও একই পরিবারের নামে এসব ডিলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও ডিলার পরিবর্তনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার বলে মনে করছে অনেকে।

এদিকে আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের খন্দকার মো: নাজমুস সালাম, তার প্রতিষ্ঠানের নাম এম এস এন্টারপ্রাইজ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নাজমুস সালাম আন্দুলবাড়ীয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তিনি ঢাকায় বসবাস করেন। ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে তিনি আন্দুলবাড়ীয়া বাজারে ডিলারশিপ নিয়েছেন।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার মো: নাজমুস সালামের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাকে না পেয়ে। কথা হয় মুঠোফোনে তার ম্যানেজার মামুনের সাথে প্রতিবেদককে বক্তব্য দিতে অনীহা জানিয়ে অসহযোগিতা মূলক’ আচরণ করেন। ফলে খন্দকার মো: নাজমুস সালামের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিক ভাবে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জীবননগর বাজার মেসার্স তবিবর রহমান ও সোহেল ট্রেডার্সের মালিক হাজী তবিবর রহমানের সার বিক্রির সার্ভিস সেন্টারে তথ্য জানতে গিয়ে তাকে না পেয়ে তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে বক্তব্য দিতে অনীহা জানিয়ে বলেন, আপনি সভাপতি অথবা কৃষি অফিসারের সাথে যোগাযোগ করুন।

উথলী ইউনিয়নের জহির উদ্দিন স্বীকার করে বলেন, ‘একটা লাইসেন্স আমার এবং একটা আমার স্ত্রী নাসিমা খাতুনের নামে আছে। এগুলো পেতে অনেক কষ্ট হয়েছে। ’

সম্প্রতি সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে সার সংকট এবং একই পরিবারের একজন ব্যক্তি একাধিক সার ডিলারশিপের মালিক। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানতে কথা বলার জন্য জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেনের অফিসে গিয়ে তাকে না পেয়ে
মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে বলেন, আমি এখন লাঞ্চে আছি’ আপনি ১০ মিনিট অপেক্ষা করেন আমি আসছি। দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে কৃষি কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনকে না পেয়ে পরে আর ফিরে আসি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুল ইসলাম জানান, কোথাও অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সেল তদন্ত করে সেসব ডিলারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।