দৈনিক পদ্মা সংবাদ।
দূর থেকে ভেসে আসা কোনও পরিচিত সুর, হঠাৎ রেডিয়োয় বেজে ওঠা গান— লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে বাংলা গান মানেই যেন পুরনো স্মৃতির দরজা খুলে যাওয়া। তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা তেমনই কয়েকটি অমলিন বাংলা গান।
লতা দীননাথ মঙ্গেশকর— ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। মধ্যপ্রদেশের ইন্দৌরে এক মরাঠী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পীর কণ্ঠে একাধিক প্রজন্মের গান পেয়েছে নতুন জীবন। হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। তবে বাংলা গানেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন, রাহুল দেববর্মন-সহ একাধিক বাঙালি সুরকারের সুরে গান গেয়েছেন লতা। ফলে বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছেও তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছে এক বিশেষ আবেগের নাম।
তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক বাংলা গানে লতা মঙ্গেশকরের সেইসব সৃষ্টি, যেগুলি আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে সমান উজ্জ্বল।
‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে’
বাংলা আধুনিক গানে লতা মঙ্গেশকরের প্রবেশের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথম সারিতেই আসে ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে’। ১৯৫৬ সালে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে এবং পবিত্র মিত্রের কথায় গানটি গেয়েছিলেন লতা।
বাংলা গানের জগতে তাঁর পরবর্তী বিপুল জনপ্রিয়তার পথ তৈরি করতে এই গানটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কোমল সুর, আবেগঘন কথা এবং লতার স্বতন্ত্র কণ্ঠ— সব মিলিয়ে গানটি আজও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের।
‘যা রে যারে উড়ে যা রে পাখি’
লতা মঙ্গেশকর ও সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত-জুটির কথা উঠলে একাধিক জনপ্রিয় গানের সঙ্গে ফিরে আসে ‘যা রে যারে উড়ে যা রে পাখি’-র নামও।
গানটির কথা ও সুর দু’টিই সলিল চৌধুরীর। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত এই গান শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সময় পেরিয়ে গেলেও গানটির আবেদন কমেনি।
এই সুরের জনপ্রিয়তার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, পরবর্তী সময়ে হিন্দি গানেও এর ব্যবহার দেখা যায়। ১৯৬১ সালের ‘মায়া’ ছবির ‘যা রে যা রে উড় যা রে পঞ্ছী’ গানটি একই সুরের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল।
‘না যেও না, রজনী এখনও বাকি’
প্রেম, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের মিশ্র আবহে তৈরি ‘না যেও না, রজনী এখনও বাকি’ লতা মঙ্গেশকরের বাংলা গানের ভান্ডারের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি।
সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে গাওয়া এই গানটির আবেগ আজও শ্রোতাকে স্পর্শ করে। বাংলা গানের এই সুর পরবর্তী সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রেও নতুন রূপ পেয়েছিল। ১৯৬০ সালের ‘পরখ’ ছবির জনপ্রিয় গান ‘ও সজনা, বরখা বাহার আই’-এর সুরের সঙ্গে এই বাংলা গানের সাদৃশ্য রয়েছে।
‘ওগো আর কিছু তো নাই’
সলিল চৌধুরীর সুরে লতা মঙ্গেশকরের অসংখ্য গান বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য একটি নাম ‘ওগো আর কিছু তো নাই’।
গানটির সুরের পাশাপাশি কথাও শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। লতা-সলিল জুটির দীর্ঘ ও সফল সঙ্গীত-সম্পর্কের কথা উঠলে এই গানটিও বারবার ফিরে আসে।
এই গানের সুরও পরবর্তী সময়ে হিন্দি ছবিতে ব্যবহৃত হয়। ‘মায়া’ ছবির ‘তসবীর তেরী দিল মে’ গানটিতে সেই সুরের ব্যবহার শোনা যায়। গানটিতে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন মহম্মদ রফি।
‘কে প্রথম কাছে এসেছি’
শুধু আধুনিক বাংলা গানের অ্যালবামেই নয়, বাংলা চলচ্চিত্রেও লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে রয়েছে একাধিক স্মরণীয় গান। তারই একটি ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’।
উত্তমকুমার ও মাধবী মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘শঙ্খবেলা’ ছবির এই গানটি আজও শ্রোতাদের কাছে পরিচিত। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গানটি গেয়েছিলেন মান্না দে। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় গানটির সুর করেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত।
লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে বাংলা গান তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের স্মৃতি নয়। তাঁর গাওয়া গান পেরিয়ে গিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কোনও নিঝুম সন্ধ্যায় দূর থেকে ভেসে আসা সেই পরিচিত সুর আজও শ্রোতাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরনো দিনগুলির কাছে— যেখানে গান, স্মৃতি আর আবেগ একাকার হয়ে যায়।