বগুড়া প্রতিনিধি:
বগুড়া শহর ও এর আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাতমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেলে বিকট শব্দে মহড়া ও হিরোগিরির পাশাপাশি খুন, ছিনতাই এবং ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ বেড়েই চলেছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি এক কলেজছাত্রীকে রাস্তায় আটকে অপহরণের চেষ্টা ও মাথায় ছুরিকাঘাত করার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
গত রবিবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে সাইদা রাইসা লাবিবা (১৭) নামের এক কলেজছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোচিংয়ের জন্য জলেশ্বরীতলায় উদ্ভাস কোচিং সেন্টারে যাচ্ছিলেন। পথে কিশোর গ্যাংয়ের লিডার রেজওয়ানুল হাসান রাতুল ও তার সহযোগীরা তাকে উত্ত্যক্ত করে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দুপুর দেড়টার দিকে ডক্টরস ক্লিনিক-১ এর গলির সামনে তার পথরোধ করা হয় এবং জোরপূর্বক রিকশা থেকে নামিয়ে রাতুলের মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এ সময় মেয়েটি চিৎকার শুরু করলে রাতুল, সিনান রহমান স্বপ্নীল (১৫), নূরে মোজাচ্ছেম কাইফসহ (১৬) আরও কয়েকজন তাকে মারধর করে। একপর্যায়ে ছাত্রীটি রাস্তায় পড়ে গেলে রাতুল তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ডক্টরস ক্লিনিকে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা সাইদ-উল হক তিনজনের নামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি রাতুল, স্বপ্নীল ও কাইফকে গ্রেপ্তার করে। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ডিবির এসআই শামীম আহমেদের নেতৃত্বে শহরের বনানী, সূত্রাপুর ও জেলখানা মোড় এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর শনিবার রাতে জলেশ্বরীতলায় অর্ধশাধীক কিশোরের দুটি গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী মারামারির ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল শাকপালায় সিয়াম নামের এক স্কুল শিক্ষার্থীও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়েছিল। জলেশ্বরীতলা, মালতিনগর, খন্দার স্টেডিয়াম এলাকা, সেউজগাড়ী, চেলোপাড়া, নারুলি, চকসূত্রাপুর, বাদুড়তলা, উপশহর ও বনানীসহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে কিশোর গ্যাংয়ের শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জেলার ১৩টি উপজেলার গ্রামাঞ্চলেও এদের প্রভাব বিস্তার বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার, পারিবারিক তদারকির অভাব, খেলার মাঠের সংকট এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা ‘বড় ভাই’ সংস্কৃতির কারণে উঠতি বয়সী কিশোররা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবু সায়েম জানান, পারিবারিক উদাসীনতা ও ভুয়া ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার লোভ কিশোরদের অপরাধজগতে ঠেলে দিচ্ছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বিশেষ নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে বার্মিজ চাকুসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে এবং এই বিষয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।