মোঃ আব্দুর রহমান অনিক ।।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি মরহুম খন্দকার শওকত আলীর রুহের মাগফিরাত কামনায় স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে দর্শনা রেল ইয়ার্ড চত্বরে দর্শনা পৌর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে এ স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
মরহুম খন্দকার শওকত আলী গত ৬ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে নিজ বাড়িতে হৃদ্ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন।
দর্শনা পৌর বিএনপির প্রধান সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান বুলেটের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির সমন্বয় কমিটির সদস্য শাহ মো. এনামুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজিএমইএর সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন, দর্শনা পৌর বিএনপির সমন্বয় কমিটির সদস্য হাজী মশিউর রহমান, নাহারুল ইসলাম মাস্টার, ইকবাল হোসেন, নাসির উদ্দীন, রেজাউলসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
স্মরণ সভায় পৌর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদস্থ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে মরহুমের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

এসময় প্রধান অতিথি চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, মরহুম শওকত আলী খন্দকার একজন ত্যাগী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার সবচেয়ে বড়গুন ছিল সর্বদাই সত্য কথা বলতেন।
আমাদেরকে অনেক সময় স্পষ্ট কথা বলতে হয়, অনেক সময় রূঢ় আচরণ করতে হয়।
আজকে মরহুম হাজী শওকত আলীর এই স্মরণ সভায় আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করব, উনাকে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। একই সাথে আমরা যারা স্পষ্ট কথা বলি বা বলার চেষ্টা করি, আমাদেরকেও ক্ষমা করে দেবেন।
রাজনীতিতে দুইটা জিনিস একসাথে চলা খুব কঠিন। হাজী শওকত আলী সাহেব বুদ্ধিমান ছিলেন, উনি একটাই বেছে নিয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে এই রাজনীতি করা, স্পষ্ট কথা বলা, কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। আমার জানামতে উনি কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই বা করতে চানও নাই।
কারণ এই দুইটার সমন্বয় করা খুব কঠিন। আপনি স্পষ্ট কথা বলবেন, সঠিক কথাটা বলার চেষ্টা করবেন, আবার নির্বাচনেও দাঁড়াবেন সেই নির্বাচনে জয় লাভ করা খুব কঠিন। তার বড় প্রমাণ হলো বিগত জাতীয় নির্বাচন।
আমি আমার জেলা সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক এখানে যে কথাগুলো বলে গিয়েছেন, সেটার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। আমি যেটা বলতে চাই, আজকে মরহুম খন্দকার শওকত আলী সাহেব একই সাথে ভাগ্যবান এবং দুর্ভাগা।
উনি ভাগ্যবান এইজন্য, অন্তত মৃত্যুর আগে দেখে গিয়েছেন স্বৈরাচারের পতন। মৃত্যুর আগে উনি দেখে গিয়েছেন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য সন্তান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। এটা উনি দেখে গিয়েছেন।
কিন্তু এই দর্শনারই অনেক সুযোগ্য নেতা এটা দেখে যেতে পাননি। আমার খুব চারজনের কথা স্মরণ পড়ছে লিয়াকত আলী শাহ্, এর আগে আক্তার ভাই সম্ভবত দল ক্ষমতায় থাকাটা দেখে গিয়েছেন, এর বাইরেও আরও অনেক নেতা বিগত ১৬–১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে অথবা বিরোধী দলের রাজনীতি করার কারণে অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়েছেন। তাঁরা অনেকেই দেখে যেতে পারেননি যে তাঁদের প্রিয় দল, আমাদের জাতীয়তাবাদী দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।
ওনার দুর্ভাগ্য যে একটি ঐক্যবদ্ধ দর্শনা পৌর বিএনপি দেখে যেতে পারেননি। উনি দেখে যেতে পারেননি, আমরা যদি মনে করি ওনার আত্মার শান্তি পাবে, তাহলে আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ পৌর বিএনপি করার চেষ্টা করব। খুব কঠিন কাজ, অসম্ভব না।
এই ঐক্যবদ্ধ পৌর বিএনপি যে হচ্ছে না, এর সিংহভাগ দায় আমার নিজের। আমার উচিত ছিল একটা ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন একটা কমিটি করে দেওয়া। এটা আমি করি নাই। আমি চেয়েছিলাম যে পৌর বিএনপির—যেহেতু চুয়াডাঙ্গা জেলা, শুধু চুয়াডাঙ্গা-২ আসন না, চুয়াডাঙ্গা জেলায় এই দর্শনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়, রাজনীতি আবর্তিত হয়—আমি চেয়েছিলাম যে আপনারা ঠিক করে নেবেন আপনাদের নেতৃত্ব।
তো সেই কাজটা আপনারাও করেননি, আমিও করতে পারিনি। সেজন্য আমি আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু কমিটি আমার দায়িত্ব থাকাকালীন সময়েই করে দেব।
অন্তত খন্দকার হাজী শওকত আলীর আত্মা যেন শান্তি পায়, সেইজন্য হলেও একটা কমিটি করব। দয়া করে আমার সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক জনাব শরিফুজ্জামান শরিফ যেটা বলেছেন দলের নেতৃত্ব মেনে নেবেন।
দলের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে, দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে আগামী স্থানীয় নির্বাচনেও।
আজকে এই স্মরণসভায় এই কথাগুলো বলা প্রাসঙ্গিক কিনা, এটা নিয়ে যদি আপনার প্রশ্ন আসে, তাহলে আমি বলব অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। একজন নেতার মৃত্যু উপলক্ষে আজকে যখন আমরা স্মরণসভায় কথা বলব, সাথে সাথে আমরা সাংগঠনিক কথা বলব; কারণ দল সংগঠিত হলে, দল বারবার নির্বাচিত হলে জনগণ দ্বারা, তাহলে তাঁদের আত্মা শান্তি পায়। আর যদি দল প্রতিবারই পথভ্রষ্ট হয়, তাহলে অবশ্যই তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে না।
আজকে দর্শনার অনেক নেতাদের কথা এখানে আমার মনে পড়ছে। আমি একটু আগে আক্তার ভাইয়ের কথা বলেছি, লিয়াকত আলী সাহেবের কথা বলেছি, এর আগে সাইফুর ভাই মারা গেছেন, আমাদের বর্ষীয়ান নেতা মোজাম্মেল হক সাহেব ছিলেন দর্শনার নেতা, আমাদের রহিম আলী ভাই ছিলেন, এর বাইরেও আমাদের অনেক তরুণ তুর্কিকে আমরা হারিয়েছি।
আজকে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সাথে সাথে আবারও বলছি, দল বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় এক ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, আর দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়।
আপনারা হয়তো অনেকে জানেন, অনেকে জানেন না নিকট অতীতে দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক (জেলা বিএনপির) এবং ইউনিটগুলোর সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতিকে আমাদের দলের চেয়ারম্যান, দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ডেকে নিয়েছিলেন। অনেক কথা বলেছেন।
অন্যতম প্রধান কথা হচ্ছে এই স্থানীয় নির্বাচনে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করবে, তারা দলে অবস্থান করতে পারবেন না।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দল হয়তো ততটা কঠোর ছিল না, কিন্তু যেহেতু একই সাথে উনাকে দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছে, একই সাথে যারা ফ্যাসিজমের সাথে যুক্ত ছিল তাদেরকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে, একই সাথে যারা গুপ্ত রাজনীতিতে বিশ্বাস করে তাদেরকেও মোকাবেলা করতে হচ্ছে এই কঠিন কাজটা করার সাথে সাথে যদি দলের মধ্যে কেউ বিভ্রান্তি তৈরি করতে চায়, তাহলে তাদের ব্যাপারে দল কখনোই ছাড় দেবে না।
আসুন, আমরা আজকে সবাই মিলে আমাদের দর্শনার প্রিয় নেতা, মরহুম হাজী শওকত আলী সাহেবের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার সাথে সাথে, আমরা ঐক্যবদ্ধ বিএনপি গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। এই ওয়াদা আজকে করব আজকের এই শোকসভায়।
সবাইকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
অনুষ্ঠানের শেষে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয় এবং উপস্থিত সবার মাঝে তবারক বিতরণ করা হয়।