বিশেষ প্রতিনিধি:

যে ঘরে নতুন প্রাণের আগমনে আনন্দধ্বনি ওঠার কথা, সেই ঘরটি আজ শোকে স্তব্ধ। যে বাবা সন্তানের মুখ দেখে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। বাবার মৃত্যুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে পৃথিবীর আলো দেখা নবজাতক ও স্বজন হারানোর এই নির্মম পরিহাসে শোকে মুহ্যমান একটি পরিবার।

মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি ইউনিয়নের কন্যাদাহ গ্রামে। নিহত হাবিবুর রহমান (২৫) ওই গ্রামের হযরত আলীর ছেলে এবং তাঁর স্ত্রী মিম খাতুন (১৭) পার্শ্ববর্তী সেতাই গ্রামের ফারুক হোসেনের মেয়ে। হাবিবুর বেনাপোল বন্দরে শ্রমিকের কাজ করতেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর তীব্র জ্বর ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে হাবিবুর বাগআঁচড়ার একটি স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। রাজধানীর মগবাজারের রাজমনু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

এদিকে স্বামীর সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মিম প্রসববেদনায় কাতর হয়ে তখন ভর্তি ছিলেন বাগআঁচড়া নার্সিং হোম ক্লিনিকে। স্বামীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর ঠিক ১৫ মিনিট আগে তিনি এক পুত্রসন্তান জন্ম দেন।

একদিকে মায়ের কোলে নবজাতকের প্রথম কান্না, অন্যদিকে স্বজনদের চোখে প্রিয় মানুষকে হারানোর অশ্রু। যে সন্তানের জন্মসংবাদ শুনে বাবার মুখে হাসি ফোটার কথা, সেই সন্তান জন্মের মুহূর্তেই হারাল পিতৃস্নেহ। প্রসূতির শারীরিক অবস্থা ও মানসিক আঘাতের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়নি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সংবাদটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাবিবুরের বাবা হযরত আলীসহ স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শোকের এমন কঠিন বাস্তবতায় দিশেহারা পুরো পরিবার।

ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়া বাবা হযরত আলী বলেন, “আমার বুকজুড়ে আজ শুধু শূন্যতা। একদিকে আমার আদরের ছেলেটা চলে গেল, অন্যদিকে ঘরে এল নতুন প্রাণ। কোনটাকে কীভাবে মেনে নেব, বুঝতে পারছি না। আমার এতিম নাতিটার দিকে তাকালেই বুক ফেটে কান্না আসে।”

যে শিশুর জন্ম ঘিরে থাকার কথা ছিল বাবার উচ্ছ্বাস ও আত্মীয়স্বজনের আনন্দ, সেই শিশুকে এখন সামলাতে হবে স্বামী হারানোর শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাবিবুরের আকস্মিক মৃত্যু ও এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্থানীয়রা শোকাহত পরিবারটির প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং নবজাতকটির সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেছেন।

পরদিন সোমবার সকাল ১১টায় জানাজা শেষে নিহত হাবিবুর রহমানকে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।