ভাবতেই অবাক লাগে দেশে কাগজপত্রে না থাকলেও বাস্তবে একটি ‘হোমিওপ্যাথিক বিশ্ববিদ্যালয়’ আছে। তাও আবার যশোরের মণিরামপুরে। সেখান থেকে দেশব্যাপী শাখা খোলার অনুমতি দেয়া হচ্ছে, রেজিস্ট্রেশনও দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ‘অনুমোদিত’ শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০টি। আর এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চলছে বছরে কোটি টাকার বাণিজ্য।
কথিত এই বিশ^বিদ্যালয়ের নাম ‘আপো হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’। পাঁচ বছর ধরে চিকিৎসক তৈরির নামে এমন একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও তদারকি কর্তৃপক্ষ কার্যত অন্ধত্বের ভূমিকা পালন করছে। যার খেসারত হিসেবে তৈরি হচ্ছে ভুয়া ডাক্তার। যারা চিকিৎসার নামে সহজ-সরল মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে রীতিমতো ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার পশু হাসপাতাল রোডে (অডিটোরিয়ামের সামনে) ২০২০ সালে কথিত আপো হোমিওপ্যাথিক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে তারা আস্তানা গেড়েছে মণিরামপুর ডিগ্রি কলেজের সামনের একটি ভবনে। তারা দাবি করছে, ২০২৩ সালের ২৭ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ (হোমিওপ্যাথিক স্বাস্থ্য শিক্ষা কাউন্সিল) থেকে অনুমতি নিয়েছে। তবে অনুমতির কোনো প্রমাণপত্র দেখাতে নারাজ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক সুশীল কুমার দাশ। আর যদি সরকার কোনো ধরনের অনুমোদন দিয়েও থাকে তাহলে সারাদেশে এক নামে শাখা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কোনো সুযোগও নেই।
সূত্র জানায়, সারাদেশে যে ৬০টি শাখা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সুশীল কুমার দাশ তার নাম দেয়া হয়েছে ‘মেডিকেল ইনস্টিটিউট’। এগুলো সবই নিয়ন্ত্রণ করা হয় মণিরামপুরের ওই কথিত আপো হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
কিন্তু, সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান যদি হোমিওপ্যাথিক শিক্ষা কার্যক্রম বা চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করতে চায় তাদের অবশ্যই ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড’ থেকে অনুমতি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দ্বিতীয় পক্ষের কোনো স্বাস্থ্যশিক্ষা বা চিকিৎসা কার্যক্রম অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। তবে, এসব নীতির কোনো তোয়াক্কা করেন না সুশীল কুমার দাস। তিনি নিয়োগ ও শাখা প্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতির নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। প্রধানত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং একটি ওয়েবসাইটে সুশীল দাস এই প্রতিষ্ঠানের প্রচার ও প্রচারণা চালান। এভাবেই তিনি ‘শিকার’ করেন বলেও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
বেসরকারি হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ স্থাপন নীতিমালায় মোটা দাগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যস্থাপনা কমিটিতে সদস্য সংখ্যা থাকতে হবে ১১ জন। ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হবেন জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমি থাকতে হবে। যে ভবনে কলেজের কার্যক্রম চলবে সেখানে কমপক্ষে পাঁচ হাজার বর্গফুট জায়গা থাকতে হবে। উপযুক্তভাবে সজ্জিত গবেষণাগার ও বর্হিবিভাগ চিকিৎসাকেন্দ্র থাকবে। ইন্টার্নশিপের জন্য কমপক্ষে দশটি বেডসম্বলিত ইনডোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কিন্তু, নীতিমালায় উল্লেখিত কোনো নিয়ম মানা হয়নি এ প্রতিষ্ঠান স্থাপনার ক্ষেত্রে। নীতিমালায় সব থেকে জোরারোপ করা হয়েছে নিজস্ব ভবনের বিষয়ে। তবে, কথিত এই বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। তাদের কার্যক্রম চলে ভাড়ায় এ ভবন থেকে সে ভবনে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যে ভবনে রয়েছে তার মালিক হাজী বাবর আলী নামে এক ব্যক্তি।
সরেজমিনে দেখা যায়, গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরি বলতে যা রয়েছে তা দিয়ে আসলে কোন্ গবেষণা চলে তা বলা মুশকিল। সেই মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এখানে, তাও আবার নামকাওয়াস্তে। ইন্টার্নশিপের কমপক্ষে দশটি বেডসম্বলিত ইনডোর ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়াম্যান জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত তামান্না গ্রামের কাগজকে বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
আপো হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক সুশীল কুমার দাস গ্রামের কাগজকে বলেছেন, ‘আপনি বারে বারে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করেন কেন, আমি ব্যস্ততার কারণে সব সময় ফোন ধরি না। আর আমার বক্তব্য নিতে চাইলে আমার অফিসে আসেন, ফোনে আমি কোনো কথা বলবো না’। এর পর তিনি ফোন কেটে দেন।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত তামান্না বলেন, ‘এ ধরনের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার জানা নেই। যদি বিশ্ববিদ্যালয় খুলে কেউ অনৈতিক কাজ করে সে ব্যাপারে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো’।
এদিকে, যশোরের কয়েকজন স্বনামধন্য হোমিও চিকিৎসকের সাথে কথা বললে তারাও ওই বিশ^বিদ্যালয়ের নাম শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে, বিষয়টি নিয়ে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তারা।
এসব চিকিৎসক বলেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠান খুলে রাখার সুযোগ দেয়া মানে ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ভুয়া চিকিৎসক তৈরির সুযোগ দেয়া। দেশের অসংখ্য মানুষ হোমিও চিকিৎসার প্রতি আস্থাশীল। দিন দিন এই চিকিৎসার প্রসারও ঘটছে। ফলে, কথিত বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে যেসব ভুয়া চিকিৎসক বের হবেন তাদেরকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ‘সুযোগ’ করে দেয়া হচ্ছে।