পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ১৮ বছর বয়সী সিয়াম, যিনি হেঁটে চলতে পারেন কষ্টে, স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন না এবং নিজ হাতে লিখতেও অক্ষম, তিনিও এবার অংশ নিয়েছেন ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে, অদম্য মনোবল ও ইচ্ছা শক্তিকে হাতিয়ার করে, সামনে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
কলাপাড়া পৌর শহরের রহমতপুর এলাকার বাসিন্দা এনজিওকর্মী ওবাইদুল ইসলামের বড় ছেলে সিয়াম। জন্মের এক বছর পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে হাটা, কথা বলা এবং হাতের লিখনক্ষমতায় প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। বহু চিকিৎসা করেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তবে এসব কষ্ট তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি ছিল সিয়ামের গভীর আগ্রহ। পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের অদম্য চেষ্টায় ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪.০৭ জিপিএ অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি ইসমাইল তালুকদার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্র থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
নিজে লিখতে না পারায় বোর্ডে আবেদন করে অনুমতি নিয়ে শ্রুতি লেখকের মাধ্যমে পরীক্ষা দিচ্ছেন সিয়াম। পরীক্ষা কেন্দ্রে তিনি অস্পষ্টভাবে বলছেন, আর সেই কথাগুলোই লিখে দিচ্ছেন আমতলীর কুকুয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজিব হোসেন।
সিয়াম বলেন, আমার পড়াশোনা করতে খুব ভালো লাগে। বাবা-মা, শিক্ষকসহ সবাই আমাকে সাহায্য করে। এখন পর্যন্ত সব পরীক্ষাই ভালো হয়েছে। আমি চাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বড় কিছু করতে। সবার দোয়া চাই।
শ্রুতি লেখক রাজিব জানান, সিয়াম ভাইয়ের মতো একজন মেধাবী ও সংগ্রামী মানুষের পাশে থাকতে পেরে আমি গর্বিত।
সিয়ামের বাবা ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ওর লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। ঘরে বসে সবসময় লেখাপড়ায় ডুবে থাকে। তাই শত কষ্টেও চাই, ও যতদূর সম্ভব পড়ালেখা চালিয়ে যাক।
আরও পড়ুন…
কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার
মা জয়নব বেগম বলেন, এক বছর বয়সে নিউমোনিয়া হওয়ার পর থেকেই সমস্যার শুরু। বহু চিকিৎসা করিয়েছি। এখন অনেকটাই ভালো, তবে ওষুধ এখনও চলছে। আমার ছেলের জন্য সবার দোয়া চাই।
ইসমাইল তালুকদার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ আবু সালেহ বলেন, সিয়াম আমাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতোই নিয়মিত ক্লাস করেছে। তার শ্রবণশক্তি ভালো এবং সে অত্যন্ত মেধাবী। আমরা আশাবাদী, সে ভালো ফলাফল করে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাবে।
পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কলাপাড়া উপজেলার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান খান বলেন, বোর্ডের অনুমতি নিয়েই সে শ্রুতি লেখকের মাধ্যমে পরীক্ষা দিচ্ছে। এতে কোনো আইনি জটিলতা নেই। তার সঙ্গে কথা বলেই বোঝা গেছে, সে সত্যিই প্রতিভাবান।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে জীবনের পথে বাধা নয়, তা প্রমাণ করছেন সিয়াম। তাঁর মতো মানুষের গল্প সমাজে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়। সবার দোয়া ও ভালোবাসায় হয়তো একদিন দেশের গর্ব হয়ে উঠবে এই তরুণ।