আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
সাত বছরের দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে প্রায় এক লক্ষ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহম্মদ বিন সালমান। তার পরই জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান বদলে যাওয়ায় নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বহু বিশেষজ্ঞ বলছেন—বিনিয়োগ পাওয়ার আশায় “নৈতিকতা বিসর্জন দিল” ওয়াশিংটন।
ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক হোয়াইট হাউসে সালমানকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অভ্যর্থনা। লাল কার্পেট, সামরিক ফ্লাই–পাস্ট এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর এফ-৩৫ লাইটনিং–২ যুদ্ধবিমানের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় সফরের আনুষ্ঠানিকতা। পরে ওভাল অফিসে দুই নেতা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
বৈঠকের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন—রিয়াদ থেকে বিপুল বিনিয়োগ আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সৌদির প্রতিরক্ষা কাঠামো আধুনিকীকরণে এফ-৩৫ স্টেলথ জেট সরবরাহ করবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ভবিষ্যতে সৌদি বিমানবাহিনী ৪৮টি এফ-৩৫ ও ৩০০ ট্যাঙ্ক পেতে পারে।
বৈঠকের পর যখন সাংবাদিকেরা খাশোগি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুললেন, তখনই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ট্রাম্প। এবিসি নিউজের সাংবাদিক মেরি ব্রুস জানতে চান— যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা সৌদি রাজপরিবারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে, তবুও কেন বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখছেন?
প্রশ্ন শুনেই সাংবাদিককে চুপ করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, এই ধরনের প্রশ্ন অতিথিকে বিব্রত করে। এখন এটা প্রয়োজন নেই।
সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি
তার দাবি—যুবরাজ খাশোগি হত্যার সঙ্গে জড়িত নন এবং অপ্রমাণিত অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল বিনিয়োগ হারাতে পারে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন—এই মন্তব্যের মাধ্যমে সালমান কার্যত ‘ক্লিনচিট’ পেয়ে গেলেন।
স্মরণযোগ্য যে, খাশোগি—ওয়াশিংটন পোস্টের প্রাবন্ধিক—২০১৮ সালে ইস্তানবুলের সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের পর নিখোঁজ হন। পরে তদন্তে উঠে আসে, তাকে দূতাবাসের মধ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করে দেহ গুম করা হয়।
সৌদি রাজপরিবার ও যুবরাজের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিল খাশোগি পরিবার।
ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালীন একসময় সৌদির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার তার অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে কেবল ইসরায়েলের কাছেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ এফ-৩৫ বিমান। তাই সৌদির কাছে এই প্রযুক্তি বিক্রির সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে তেলআবিব।
নেতানিয়াহু সরকার মনে করছে—এতে ইসরায়েলের সামরিক প্রাধান্য কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছে—সৌদির হাতে যাবে কম শক্তিসম্পন্ন এফ-৩৫ সংস্করণ, এবং এআইএম-২৬০ বিয়ন্ড ভিস্যুয়াল রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হবে না। ফলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যাহত হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সালমান সুপরিকল্পিত কূটনীতি নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন। বিনিয়োগ ও অস্ত্র–ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পুরোনো অস্বস্তিকর সম্পর্ককে আবারও সুদৃঢ় করেছেন।
রিয়াদে দাঁড়িয়েই যুবরাজ ঘোষণা করেন—৮০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ ও আরও বড় অস্ত্র–ক্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাম্পও দেশে ফিরে ফক্স নিউজকে বলেন, খাশোগি হত্যায় সৌদি রাজপরিবার জড়িত—এটা নিশ্চিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশাল বিনিয়োগ হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠে না।
সৌদি আরবকে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওভাল অফিসে বসে সালমান ইঙ্গিত দেন— ইহুদি-ফিলিস্তিনি বিরোধ মেটাতে আমরা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান সমর্থন করি। যদিও এ বিষয়ে রিয়াদ এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।