আবু আলী।।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে টাকার সরবরাহ অনেকটাই বাড়বে। তবে এ সময়েও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। ফলে কর্মসংস্থানের ভাটা কাটারও তেমন কোনো আশা নেই। বরং টাকার প্রবাহ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে বাজেট বাস্তবায়নের গতিও আরও কমার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লেও বেড়েছে অনুন্নয়ন ব্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতের সরকারের পরিচালন খরচ বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের হিসেবে সরকারের পরিচালন খরচ প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থ খরচ করা যাচ্ছে না। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের হিসেবে এবারই গত আট বছরের মধ্যে উন্নয়নে সবচেয়ে কম খরচ হয়েছে। সরকারের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চার মাসে ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা।

এই ঘাটতি হতাশাজনক বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে মানুষের ভোগের মাত্রা আরও বাড়বে। সামগ্রিক ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। আবার বাজারে টাকার সরবরাহও বাড়বে। এতে করে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

অন্যদিকে গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সর্বশেষ অক্টোবর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে এনেছে, তবুও তা বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনও অনেক বেশি। আটকে আছে কর্মসংস্থানের চাকা। মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

জানা গেছে, দেশের সব শ্রেণির ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থানীহানতাও বেড়েছে। একইভাবে বাড়ছে ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তাও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় একটি ইন্ডিকেটর হলোÑ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। এই মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে ১১ শতাংশ। ফলে নতুন করে কোনো কারখানা তো হচ্ছেই না; বরং পুরনো অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেগুলো পুনরায় চালু করা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির পরিধি যেভাবে বাড়ছে, এর বিপরীতে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে পুঁজিবাজার। গত কয়েক বছরে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ থেকে কমে ১৬ লাখে নেমেছে। এর মধ্যে সক্রিয় বিনিয়োগকারী ১২ লাখের কম। অর্থাৎ, ক্রমেই সংকুচিত বা ছোট হয়ে আসছে শেয়ারবাজারের পরিধি। এ ছাড়া কর ব্যবস্থাসহ সামগ্রিকভাবে বাজারের কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা পদে পদে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছেও শেয়ারবাজারের গুরুত্ব কমেছে। মহাসংকটে শেয়ারবাজার। দেখার কেউ নেই। সরকারের নীতিনির্ধারকদের শেয়ারবাজারের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত নেতিবাচক। বর্তমানে শেয়ারবাজার সব দিক থেকে সংকটে। নতুন কোনো আইপিও আসছে না। বাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে না। কিন্তু এ ব্যাপারে কারও কোনো উদ্যোগ নেই।

এদিকে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশÑ অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য যে কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আবারও দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল আমারিতে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সময়ে চরম দারিদ্র্য ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মাঝারি দারিদ্র্য ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্যন্যা অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আবারও দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ অঙ্ক শুধু আর্থিক খাতের দুর্বলতাকেই উন্মোচন করছে না, বাড়িয়ে দিচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগও। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কার ছাড়া সামনের দিনে ভার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, নিয়মনীতি স?ঠিক পরিপালনের কারণে এখন তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।