মোঃ আব্দুর রহমান অনিক।।
দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের চলতি ২০২৫–২৬ আখ মাড়াই মৌসুমের সমাপ্তি ঘটছে আজ শুক্রবার। গত ৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই মৌসুমটি ৬২ দিনের নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও মৌসুম শেষে এবারও চিনিকলটি লাভের মুখ দেখছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কেরু চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানান, চলতি মৌসুমে ৬৮ কার্যদিবসে ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ দশমিক ৬০ রিকভারি ধরে ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে ৬২ দিনের মাথায় আখ মাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে মিলের চিনি উৎপাদন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়।
এর আগে বাংলাদেশ সরকারের শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৫ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ২০২৫–২৬ আখ মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন করেন। কেইন কেরিয়ারে আখ নিক্ষেপের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮৮তম মাড়াই মৌসুমের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ৬২ কোটি টাকার লোকসানের বোঝা নিয়েও কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে এ মৌসুমে আখের দাম বৃদ্ধি করে মাড়াই কার্যক্রম চালু রাখে কর্তৃপক্ষ।
চলতি মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার ৫৬২ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। আখচাষিদের সহায়তায় সার ও নগদ অর্থ বাবদ প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করেছে মিল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি চাষি পর্যায়ে আখের ক্রয়মূল্য টনপ্রতি ৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কেরু চিনিকল প্রায় ৬২ কোটি টাকা লোকসান দিলেও ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে ১৯০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জনের ফলে সমন্বয় শেষে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি মোট ১২৯ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তবে চলতি মৌসুমে চিনি উৎপাদনের চূড়ান্ত হিসাব সম্পন্ন না হওয়ায় লাভ না লোকসান এ বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
কেরু কমপ্লেক্সের হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট ৬টি বিভাগের মধ্যে ৫টিতেই লাভ হয়েছে। এর মধ্যে ডিস্টিলারি বিভাগ থেকে সর্বাধিক মুনাফা আসে। ওই অর্থবছরে ফরেন লিকার উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ২২০ কেস এবং কান্ট্রি স্পিরিট উৎপাদন হয়েছে ২৪ লাখ ৮৯ হাজার প্রুফ লিটার। পাশাপাশি ভিনেগার উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার লিটার। এসব পণ্যের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক খামার থেকে আয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৯ হাজার টাকা, পরীক্ষামূলক খামার থেকে ৩০ লাখ ২ হাজার টাকা, জৈব সার কারখানা থেকে ৭৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং ফার্মাসিউটিক্যালস বিভাগ থেকে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারকে রাজস্ব ও ভ্যাট বাবদ প্রদান করা হয়েছে ১৪০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। লোকসানি চিনি কারখানার ক্ষতি পুষিয়েও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা কেরুর ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এছাড়া কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনি কলটি বাণিজ্যিক খামার, চিনি কারখানা, জৈব সার কারখানা ও ডিস্টিলারি ইউনিট নিয়ে গঠিত। চাহিদা অনুযায়ী আখ উৎপাদন না হওয়ায় চিনি উৎপাদনে কিছুটা লোকসান হলেও অন্যান্য ইউনিট নিয়মিতভাবে লাভ করে আসছে। আখ থেকে চিনি নিষ্কাশনের পর উপজাত হিসেবে চিটাগুড় ব্যবহার করে স্পিরিট, মদ, ভিনেগার ও জৈব সার উৎপাদন করা হয়।
কেরু কোম্পানির ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে বর্তমানে কান্ট্রি স্পিরিট, ফরেন লিকার, ডিনেচার্ড স্পিরিট ও রেক্টিফায়েড স্পিরিট উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি মল্ট ভিনেগার ও সাদা ভিনেগারও বাজারজাত করা হচ্ছে। কারখানাগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ প্রুফ লিটার। ডিস্টিলারি ইউনিটে ইয়েলো লেবেল মাল্টেড হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, চেরি ব্র্যান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, অরেঞ্জ কুরাকাও, রোসা রাম, ওল্ড রাম ও জারিনা ভদকার মতো পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যেগুলোর দেশের বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।
এদিকে ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি গত ২২ মে প্রথমবারের মতো দেশি মদ নামে পরিচিত কান্ট্রি স্পিরিট বোতলজাত করে বিপণন শুরু করে। এতে একটি মহলের বিরোধিতা ও চক্রান্ত দেখা দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব বাধা মোকাবিলা করে ড্রামের পরিবর্তে বোতলজাত সরবরাহ চালু করে। রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের সুপারিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদনক্রমে বোটলিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ নাগরিক রবার্ট কেরুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নানা সংকট ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রায়ত্ত এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আজও চলমান রয়েছে।
বর্তমানে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি পরীক্ষামূলক খামার, ডিস্টিলারি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ভিনেগার ও জৈব সার উৎপাদন করে আসছে। চিনি ও ডিস্টিলারি বিভাগের মোট ৯টি ব্র্যান্ডের পণ্য দেশের বাজারে ব্যাপক পরিচিতি ও চাহিদা অর্জন করেছে।।