অনলাইন ডেস্ক।।
একদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা, প্রত্যাশা ও কৌতূহল। এই নির্বাচন ঘিরে শুধু দেশের ভোটারের মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। বিশ্বের নানা প্রান্তের কূটনীতিক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা নিবিড়ভাবে অনুসরণ করছেন

ভোটের প্রস্তুতি ও পরিবেশ। বলা যায়, এবারের নির্বাচনে ব্যালট বাক্সের প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি সিল পড়ার মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করবে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার চোখ।

নির্বাচনের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহর-গ্রাম, চর-হাওর, পাহাড় ও সমতলÑ সবখানেই থাকবে নজরদারির এক বিস্তৃত বলয়। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষক, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের টিম সারা দিন মাঠে সক্রিয় থাকবে। অতীতের মতো এবারও নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ স্পষ্ট।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার দেশি পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক অনুমোদন পেয়েছেন। শেষ মুহূর্তে আরও কিছু পর্যবেক্ষক যুক্ত হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। দেশি পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন নিবন্ধিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজভিত্তিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত মিশন পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সংখ্যার পাশাপাশি

কাঠামো ও পদ্ধতির দিক থেকেও এই মিশনটি বেশ বিস্তৃত। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত এই দল নির্বাচন-পূর্ব প্রস্তুতি, প্রচারপর্ব, ভোটের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। ইইউ ছাড়াও জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিচ্ছেন।

ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারাও ভোটের দিন রাজধানী ও আশপাশের নির্বাচনী এলাকায় সরাসরি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। অনেক কূটনৈতিক মিশন এরই মধ্যে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। কেউ কেউ ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছেন। ফলে রাজধানীর বাইরের গ্রামাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোও আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় আসছে।

এই বিপুল পর্যবেক্ষণের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও উদ্বেগ। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীরা বারবার তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা প্রকাশ্যে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট আয়োজনের প্রত্যাশা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতির প্রশংসাও করেছে অনেক পক্ষ।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পর্যবেক্ষকদের অবাধ চলাচল ও কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে যেন কোনো বাধা না আসে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।

দেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও এবারের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছে। অনেক সংগঠন এরই মধ্যে তাদের পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। ভোটের দিন তারা কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করবে, অনিয়ম বা সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করবে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সংস্কার ও নীতিগত আলোচনায় ভূমিকা রাখার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশি পর্যবেক্ষকরা সাধারণত কোনো দেশের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করেন না; বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার মান, পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে মূল্যায়ন করেন। সে কারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ শুধু ভোটের দিনের চিত্র নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভোটের মাঠে এই ১ লাখ ১২ হাজার চোখের উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। অনেক ভোটারের ধারণা, এত বিপুল দেশি-বিদেশি নজরদারির মধ্যে অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, আসল পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্মীদের আচরণে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাইÑ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ।