অনলাইন ডেস্ক।।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৭টি মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ এসব মামলায় তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এখনও তদন্ত ঝুলে আছে ১ হাজার ৬২৫টি মামলা। নানাবিধ কারণে পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। এর মধ্যে ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষীর অভাবে অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে পারছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। ফলে এসব মামলার তদন্ত ঝুলে যাচ্ছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, জুলাই অভ্যুত্থান মামলার তদন্তের শুরুতে ঘটনার যেসব প্রত্যক্ষদর্শী মামলার সাক্ষী হবেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সাক্ষী দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এই তালিকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের সমন্বয়ক এবং বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীও রয়েছেন। সময় যত গড়াচ্ছে সাক্ষী না হতে তারা ততটা দূরে সরে যাচ্ছেন। তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের সাক্ষী হতে বারবার বোঝাচ্ছেন। এর ফলে কেউ কেউ মত পরিবর্তন করে সাক্ষীও হচ্ছেন। কিন্তু এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পেতে বিলম্ব হওয়ায় মামলার তদন্ত শেষ করার প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, মামলার তদন্ত যেসব কারণে বিলম্ব হচ্ছে তার মধ্যে একটি কারণ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা মামলায় সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। তারপরও অন্যান্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মামলা প্রমাণের জন্য তদন্ত কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যবিরোধী মামলার তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করছি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় গত ৩ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে ২৩৭টি মামলা। যেগুলো তদন্ত শেষে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা। ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯৯টি, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় ১ হাজার ৬৩টি মামলা রুজু হয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়। ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে ৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি মামলায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) এবং ৩৫টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত রিপোর্ট) দাখিল করা হয়েছে। হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১ হাজার ৬৩টি মামলার মধ্যে তদন্ত নিষ্পত্তি বা শেষ হয়েছে ১৪২টি। এর মধ্যে ১৩০টি মামলায় আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। ১২টি মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার মামলা মিলে মোট ১৯০টি মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
মামলা তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা হিসেবে তারা বিবেচনা করে আসছেন। যে কারণে এসব মামলায় যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি না থাকে তা তদারকিতে বিভিন্ন রেঞ্জ ও মহানগর পুলিশে মেন্টর কমিটি কাজ করছে। এসব ইউনিটের পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও মামলাগুলোর তদন্ত কাজ তদারকি করা হচ্ছে। এসব মেন্টর কমিটির কাছে তদন্ত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, চাক্ষুষ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ার কারণে তারা মামলার তদন্ত শেষ করতে পারছেন না। যখন তারা সাক্ষ্য দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তখন দেশের প্রেক্ষাপট ছিল এক রকম। এখন আরেক রকম। সাক্ষী না হতে এখন অনেকেই নানা অজুহাত খাড়া করাচ্ছেন। ফলে তদন্ত শেষ করতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মামলার আসামিদের নাম ঠিকানা যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। একেকটি মামলায় একশ থেকে শুরু করে তিনশ জন পর্যন্ত আসামি। কোনো কোনো মামলায় এর চেয়েও বেশি আসামি। তাদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা যাচাই করতে অনুসন্ধান স্লিপ পাঠান তদন্ত কর্মকর্তারা। সেই প্রতিবেদন আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
মামলাসংক্রান্ত অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন ডিজিটাল লিংকের ফরেনসিক প্রতিবেদন, হতাহতের ঘটনায় জব্দকৃত গুলির ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের মেডিক্যাল সনদ পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে মামলার তদন্ত শেষ করতেও দেরি হচ্ছে। প্রতিবেদন পেতে যেসব সরকারি হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ময়নাতদন্ত হয়েছে, সেসব হাসপাতালে দফায় দফায় চিঠি দিয়েও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন মিলছে না। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে এই প্রতিবেদন বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকালে যেসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেসব জায়গায় ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কোন সদস্য মোতায়েন ছিল সেসব তথ্য পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া মামলার বর্ণিত আসামিদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) পেতেও বিলম্বের কারণে তদন্ত আটকে যাচ্ছে। এজাহারে ঘটনাস্থলের ভুল বর্ণনা থাকা এবং মামলায় ঢালাও আসামি থাকার ঘটনাও মামলার তদন্ত জটিল করে তুলছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যেসব মৃতদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে, সেসব লাশের ময়নাতদন্ত করতে কবর থেকে লাশ উত্তোলনে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক ভিকটিমের স্বজনরা লাশ উত্তোলনে বাধা দিচ্ছেন বা উত্তোলন করতে চান না। সেক্ষেত্রেও তদন্ত ঝুলে যাচ্ছে।