‘কিং লিয়ার’-এর হিন্দি রূপান্তরে নানা পাটেকরকে চেয়েছিলেন পরিচালক, শেষ পর্যন্ত অধরাই রয়ে গেল স্বপ্ন

অনলাইন ডেক্স।
শেক্সপিয়রের কালজয়ী নাটক ‘কিং লিয়ার’ অবলম্বনে হিন্দি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন এক পরিচালক। নামভূমিকায় তাঁর প্রথম পছন্দ ছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পুনের এক গ্রামে গিয়ে অভিনেতার সঙ্গে আলোচনাও হয়েছিল। গল্প শুনে সম্মতি দিয়েছিলেন নানা, চেয়েছিলেন চিত্রনাট্যও। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি সেই স্বপ্নের প্রকল্প। রয়ে গেছে এক অপূর্ণ চলচ্চিত্রের গল্প।
‘রাজা লিয়ার’ চরিত্রে কেন নানা পাটেকর?
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়ার’ বহুবার মঞ্চ ও পর্দায় নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সেই কালজয়ী কাহিনিকে হিন্দি সিনেমার ভাষায় তুলে ধরার পরিকল্পনা থেকেই শুরু হয়েছিল এক বিশেষ উদ্যোগ। আর সেই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘রাজা লিয়ার’-এর জন্য পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন নানা পাটেকর।
নানা পাটেকর শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন, চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্যও তিনি স্বতন্ত্র। পর্দায় যে চরিত্রই ফুটিয়ে তোলেন, তার আবেগ, মনস্তত্ত্ব ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠার দক্ষতা তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতার মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর অভিনয়প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কোনও চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পছন্দ হলে প্রথমেই চিত্রনাট্য চেয়ে নেন। এরপর নিজের সংলাপ বারবার হাতে লিখে অনুশীলন করেন। প্রয়োজনে ২০ থেকে ২৫ বারও লিখতে পারেন সংলাপ। এই পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে সংলাপের ছন্দ, আবেগ ও অন্তর্নিহিত অর্থ তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। ফলে চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার প্রস্তুতি অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়।
এমন একজন অভিনেতাকে ‘রাজা লিয়ার’-এর মতো জটিল, আবেগঘন ও বহুমাত্রিক চরিত্রে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন পরিচালক।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পুনের সেই সাক্ষাৎ
২০২৩ সালের জানুয়ারি। তখন পুনের একটি গ্রামে ছিলেন নানা পাটেকর। তাঁকে ‘কিং লিয়ার’-এর হিন্দি রূপান্তর নিয়ে বিস্তারিত জানাতে সেখানে পৌঁছেছিলেন পরিচালকসহ কয়েকজন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার অঞ্জুম রাজাবলি এবং প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত এক প্রযোজক।
নানা তাঁদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। তবে সেই সাক্ষাতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অভিনেতার গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ।
মুম্বইয়ের ঝলমলে বিনোদনজগৎ থেকে দূরে গ্রামের পরিবেশে নিজেকে স্বচ্ছন্দভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন গ্রাম, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কৃষকদের সঙ্গে। কৃষিকাজের বিভিন্ন দিক এবং চাষিদের জীবনযাপনের বাস্তবতাও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁদের।
নানা পাটেকরের জীবনযাত্রায় তখন স্পষ্ট ছিল সরলতা ও মাটির কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা। বিপুল জনপ্রিয়তা, খ্যাতি ও দীর্ঘ অভিনয়জীবনের সাফল্য সত্ত্বেও তিনি নিজের পছন্দের জীবনধারাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিনোদনজগতের আলো-ঝলমলে পরিবেশের বাইরে গ্রামীণ জীবনের শান্তি ও স্বস্তির মধ্যে খুঁজেছেন অন্য রকম পরিতৃপ্তি।
গল্প শুনে সম্মতি, চিত্রনাট্যের অপেক্ষা
সাক্ষাতের একপর্যায়ে শুরু হয় মূল আলোচনা। ‘কিং লিয়ার’-এর কাহিনি এবং প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রের ভাবনা মন দিয়ে শোনেন নানা পাটেকর। গল্প নিয়ে তাঁর মনে যে প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, সেগুলিও জানতে চান।
আলোচনা শেষে তিনি প্রকল্পটিতে কাজ করার বিষয়ে সম্মতি জানান এবং চিত্রনাট্য দেখতে চান। কিন্তু সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য তাঁদের সঙ্গে ছিল না। পরে তা দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়।
সেখানেই তৈরি হয়েছিল আশার জায়গা। এমন এক অভিনেতাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা, যাঁর অভিনয়দক্ষতা ‘রাজা লিয়ার’-এর মতো গভীর চরিত্রের সঙ্গে মানানসই—প্রকল্পটির প্রতি প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি আর নির্মিত হয়নি। নানা পাটেকরের সঙ্গে কাজ করার যে স্বপ্ন নিয়ে পরিচালক এগিয়েছিলেন, তা বাস্তবের পর্দায় রূপ পেল না। থেকে গেল স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস।
কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর ভাবনা
নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু অভিনয়ের সাফল্য দিয়ে বিচার করলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অজানা থেকে যায়। কৃষকদের জীবনযাত্রার উন্নতি এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও তিনি ভাবনাচিন্তা করেছেন।
গ্রাম ঘুরে দেখার সময় পরিচালকের মনে হয়েছিল, কৃষিকাজকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন নানা। কৃষকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল আন্তরিক।
একই সঙ্গে মারাঠি চলচ্চিত্রজগতের সেই শিল্পীদের নিয়েও তিনি চিন্তা করতেন, যাঁরা একসময় নিয়মিত কাজ পেলেও পরবর্তী সময়ে সুযোগ হারিয়েছেন। তাঁদের জন্য জমি কিনে আলাদা আবাসন বা কোয়ার্টার তৈরির মাধ্যমে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে পরিচালকের স্মৃতিচারণে।
এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে শিল্পীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এবং তাঁদের জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ। যাঁরা একসময় চলচ্চিত্রজগতকে সমৃদ্ধ করেছেন, বয়স কিংবা পরিস্থিতির পরিবর্তনে যাঁদের কাজের সুযোগ কমে গেছে, তাঁদের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করার ভাবনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
অভিনেতার পাশাপাশি রসনাবিলাসী রাঁধুনি
নানা পাটেকরের আরেকটি পরিচয়—তিনি রান্না করতে ভালোবাসেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি মজার ছলেই বলেছেন, অভিনেতা হিসেবে যতটা ভালো, রাঁধুনি হিসেবে নিজেকে তার চেয়েও ভালো মনে করেন।
সেই সফরেও তাঁর এই পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন অতিথিরা। খোলা মাঠে মাটির উনুনে তিনি নিজের হাতে রান্না করেছিলেন ডাল, সবজি ও মাংসের বিভিন্ন পদ। শুধু রান্না করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; যত্ন করে অতিথিদের খাইয়েছিলেনও। বিদায়ের সময় উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন খেতের চাল।
এই ছোট ছোট মুহূর্তই নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্বের অন্য এক দিক সামনে নিয়ে আসে। পর্দায় কঠোর, তীব্র কিংবা রাগী চরিত্রে তাঁকে দেখা গেলেও ব্যক্তিগত পরিসরে তাঁর আন্তরিকতা, আতিথেয়তা এবং সহজ জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছবি তুলে ধরে।
রাগী অভিনেতার আড়ালে সংযত মানুষ
নানা পাটেকর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার একটি হলো, তিনি নাকি খুব সহজেই রেগে যান এবং নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে দ্বিধা করেন না। তবে সরাসরি সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা পরিচালকের মনে অন্য অনুভূতি তৈরি করেছিল।
তাঁর কাছে নানা পাটেকরকে যথেষ্ট সংযত ও স্থির বলেই মনে হয়েছিল। ফলে অভিনেতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিশেষ অস্বস্তি অনুভব করেননি তিনি। অবশ্য চিত্রনাট্য হাতে নিয়ে সেই আলোচনা হলে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোত, তা আর জানা সম্ভব হয়নি।
কারণ, শেষ পর্যন্ত ছবিটি তৈরি হয়নি। নানা পাটেকরের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও অধরা থেকে গেছে।
একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন, যা থেকে গেল স্মৃতিতে
চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে এমন অনেক প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর পরিকল্পনা হয়, শিল্পী নির্বাচন হয়, আলোচনা এগোয়—কিন্তু নানা কারণে সেগুলো আর পর্দায় পৌঁছায় না। ‘কিং লিয়ার’-এর প্রস্তাবিত হিন্দি রূপান্তরও তেমনই এক অপূর্ণ অধ্যায়।
এই গল্পে তাই শুধু একটি সিনেমা তৈরি না হওয়ার আক্ষেপ নেই। রয়েছে একজন অভিনেতাকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা, তাঁর জীবনবোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এবং শিল্পের বাইরেও একজন মানুষের দায়বদ্ধতার উপলব্ধি।
নানা পাটেকরকে ‘রাজা লিয়ার’ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। দর্শকেরাও হারিয়েছেন একটি সম্ভাব্য অভিনয়-অভিজ্ঞতা। আর পরিচালকের কাছে থেকে গেছে এমন এক সাক্ষাতের স্মৃতি, যেখানে চলচ্চিত্রের স্বপ্নের পাশাপাশি উঠে এসেছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষকদের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহশিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এক সহজ অথচ ব্যতিক্রমী মানুষের জীবনদর্শন।
কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় না, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোও কম মূল্যবান নয়। নানা পাটেকরকে ঘিরে ‘কিং লিয়ার’-এর এই অপূর্ণ কাহিনি তারই এক আবেগময় উদাহরণ।























