সরকারের নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য : ড. মাহবুব উল্লাহ শিগগিরই গণভোটের আদেশ

রফিক মুহাম্মদ।।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন সমঝোতা হয়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে এক সপ্তাহের যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল তাও গতকাল শেষ হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনাই হয়নি। উল্টো প্রধান দুটি দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দূরত্ব যেন আরও বেড়েছে। সরকার বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে আরও কিছুটা সময় দিতে আপত্তি নেই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দলই সময়ের জন্যও আবেদন করেনি। এক্ষত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সনদ বাস্তবায়নে ‘জুলাই আদেশ’ প্রস্তুত করছে সরকার। আগামী ১৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত সভায় এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সূত্র মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট দুটোই একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। কারণ, দুটো নির্বাচন দুই দিনে আয়োজন সম্ভব নয় বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা সরকারকে জানিয়েছে।
এ ছাড়া সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি সরকার আমলে নিয়েছে। এ দুটি বিষয় নিয়ে পর্দার আড়ালে দলগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে প্রধান দুটি দল নিজ নিজ দাবি থেকে কিছুটা ছাড় দেবে এমনটাই চাচ্ছে তারা। সূত্র বলছে, ১৩ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সবকিছু চূড়ান্ত হবে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশ এবং গণভোট করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করবে। কয়েকজন উপদেষ্টা দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। গণভোট প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতসহ তাদের সমমনা দলগুলোর অবস্থান ঠিক বিপরীত। জামায়াতের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। আর বিএনপি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে চায়। সরকার জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের পক্ষে। এ বিষয়ে জামায়াত ছাড় দেবে বলে আশা করছে সরকার। অন্যদিকে পিআর পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি এসেছে জুলাই সনদে। বিএনপির এতে আপত্তি আছে। বিএনপি এ বিষয়ে ছাড় দেবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
সূত্র জানায়, জুলাই সনদ ইস্যুকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থানকে সরকার চূড়ান্ত অবস্থান হিসাবে দেখছে না। মাঠ চাঙা রাখার জন্য এটি তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। সরকারের ধারণা প্রকাশ্যে এই কঠোর অবস্থান থেকে অবশ্যই তারা ছাড় দেবে। এক্ষেত্রে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চলছে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার ওপর ছেড়ে দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ফলে বৃহস্পতিবারের আগেও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে না। তবে প্রধান উপদেষ্টা চাইলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা কথা বলতে পারেন। তবে যা-ই হোক, সরকার দ্রুতই অর্থাৎ চলতি সপ্তাহের মধ্যে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন যারা তাদের মধ্যে সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, সব দল, বিশেষ করে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের দাবি একটু একটু সমন্বয় করে সরকার সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকার নিজের মতো করেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাই সনদ ইস্যুতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব (সম্ভব হলে এক সপ্তাহের মধ্যে) রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক সপ্তাহ শেষ হয়েছে। তবে সপ্তাহের মধ্যেই হতে হবে, এমন নয়। এখনো সময় আছে। দলগুলো চাইলে আরও সময় নিতে পারে। সরকার আরও অপেক্ষা করবে। এরপরও সমাধান না হলে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ২৮ অক্টোবর সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এতে বলা হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার একটি আদেশ জারি করবে। কিন্তু আদেশ জারির আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক শেষে জানানো হয় গণভোটের সময় এবং বিষয়বস্তু নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর আহ্বান করা হয়। এদিকে সরকারের আহ্বানের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলগুলো কোনো সমঝোতায় আসতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামী বলছে, তারা বিএনপিকে আলোচনার আহ্বান জানালেও দলটি তাতে সাড়া দেয়নি। আর বিএনপি বলছে, আলোচনার উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। এদিকে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সমঝোতার জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। এ কারণে জামায়াত ও এনসিপিও সরকারের উদ্যোগ চায়।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিলতা সমাধানের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করে সমাধানের পথ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে, বাংলাদেশ নতুন করে একটি বড় সংকটের দিকে ধাবিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকেই মধ্যস্থতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফসর ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা চালানোর জন্য একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা প্রয়োজন। যেহেতু সরকার ড্রাইভিং সিটে আছেন, তাই মধ্যস্থতা ও সমঝোতার দায়িত্ব সরকারের। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ঐকমত্যে পৌঁছায় না, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে।
























