চুয়াডাঙ্গা ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ার, পরিসংখ্যান ও রেকর্ড

Padma Sangbad

স্পোর্টস ডেস্ক।।

আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের ২১ বছর পর, ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী মেসি অবশ্য এর আগেও একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তার সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত বিদায়ের আবহই স্পষ্ট।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সর্বশেষ ম্যাচ ছিল ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল। ১-০ গোলে হেরে সেই ম্যাচে বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা নিখুঁত হয়নি। তবে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা ইতোমধ্যেই নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে তার অর্জন তাই দিয়েগো মারাদোনার রেখে যাওয়া কিংবদন্তির উত্তরাধিকারকে যথার্থভাবেই ধারণ করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হাতে লেখা নোটের ছবি প্রকাশ করে সোমবার আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের মাত্র দুই দিন পরই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল মেসির।

২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর থেকেই মেসি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দের অসংখ্য উপলক্ষ এনে দিয়েছেন। উপহার দিয়েছেন এমন সব স্মরণীয় মুহূর্ত ও শিরোপা, যা চিরকাল তার উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে থাকবে। আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক সোনা ও ফাইনালিসিমার শিরোপা। জাতীয় দলের জার্সিতে তাই তিনি হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী খেলোয়াড়।

আজ বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে গেলেও মেসির জাতীয় দলের হয়ে খেলা ক্যারিয়ারের সেই স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ফিরে দেখা যাক, যেগুলো তাকে চিরকাল আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের পাতায় বাঁচিয়ে রাখবে।

২০২২: অবশেষে বিশ্বকাপ জয়

ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে গনসালো মন্তিয়েল জয়সূচক পেনাল্টি করার পর মেসির হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার দৃশ্যটি কে ভুলতে পারে!

৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেন অধিনায়ক মেসি। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপাটিও যুক্ত হয় তার অর্জনের তালিকায়।

ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে করেন দুটি গোল এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার প্রথম পেনাল্টিটি জালে পাঠান। জাতীয় দলের হয়ে ১৫ বছরের বেশি সময় প্রতিনিধিত্ব করার পর অবশেষে পান কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপের স্বাদ।

২০২৬: বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি

৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি কেমন করবেন, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন ছিল। চার বছর আগে বিশ্বকাপ জিতে নিজের জন্যই তিনি যে উচ্চ মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন, তা ছিল অনেক উঁচু। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে সব সংশয় দূর করেন তিনি।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মেসি। তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর তার গোল ছিল ১৬টি। জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যেতে প্রয়োজন ছিল আরও একটি গোলের। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিস করলেও পরে দুটি গোল করে সেই ভুল পুষিয়ে দেন মেসি।

শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ শেষ করেন ২২ গোল নিয়ে। তবে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে মেসির ইতিহাস গড়ার মুহূর্তটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

২০১৬: চিলির কাছে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসর

সোমবারই প্রথম নয়, এর আগেও জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি।

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। ম্যাচের পর সংবাদকর্মীদের সামনে তার সেই ঘোষণা সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিল।

মেসি বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার ভাবনা এবং ড্রেসিংরুমে বসে ভাবার পর মনে হচ্ছে, জাতীয় দলের হয়ে আমার খেলা শেষ।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এটি ছিল চারটি ফাইনাল, কিন্তু কোনোটি জিততে পারিনি। সম্ভব সবকিছুই করেছি। অন্য সবার চেয়ে এই পরাজয় আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। কিন্তু স্পষ্টতই এটা আমার জন্য নয়। জাতীয় দলের হয়ে একটি শিরোপা জিততে আমিই সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি।’

তবে পরে ফিরে আসেন মেসি। এরপর টানা দুটি কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি একের পর এক ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়েন।

২০০৬: বিশ্বকাপে অভিষেক

২০০৬ সালের ১৬ জুন বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির আগমনের দিন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ১৮ বছর বয়সী মেসি ৭৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন।

মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোল করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি। ম্যাচে একটি গোল ও একটি সহায়তা করেন মেসি। আর্জেন্টিনা জেতে ৬-০ গোলে।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সেটিই ছিল মেসির উপহার দেওয়া অসংখ্য আনন্দের মুহূর্তের প্রথমটি।

২০২২: মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য গোল

কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে মেসির সেই দুর্দান্ত গোলটি না হলে আর্জেন্টিনার গল্পটি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হেরে গেলে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় ছিল আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া হয়ে জয়ের পথ খুঁজছিল আর্জেন্টিনা।

অবশেষে ৬৪ মিনিটে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে জাল কাঁপান মেসি। তার সেই গোল আর্জেন্টিনাকে অনুপ্রাণিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় পায় দলটি। সেই জয়ই পরবর্তী সময়ে বিশ্বকাপ জয়ের পথে বড় ভূমিকা রাখে।

২০১৪: জার্মানির কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার

২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেন মেসি। প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি।

ম্যাচে আর্জেন্টিনা কঠিন লড়াই করলেও অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের গোল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। আর্জেন্টিনা হারলেও পুরো আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য মেসি জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

সাত ম্যাচে চার গোল ও একটি সহায়তা করেছিলেন তিনি।

সেই পরাজয়ের পরই মেসি আরও শক্তভাবে ফিরে এসে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আট বছর পর সেই প্রতিজ্ঞা পূরণও করেন।

২০২১: কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার শিরোপা-খরা কাটানো

২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে ২০২১ সালে অধিনায়ক হিসেবে কোপা আমেরিকার শিরোপা হাতে তোলেন মেসি।

রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটায় আর্জেন্টিনা।

মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে মেসির গল্পটাও যেন বদলে যায়। যে কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা তাঁকে একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, সেই প্রতিযোগিতার শিরোপাই শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে ওঠে।

২০০৫: অভিষেকের পরই লাল কার্ড

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় ১৮ বছর বয়সী মেসির।

তবে অভিষেকটি ছিল তিক্ত-মধুর। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও স্বপ্নের মতো ছিল না। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে সেই লাল কার্ডের স্মৃতি বহু আগেই মুছে দিয়েছেন মেসি।

২০১০: কোচ ম্যারাডোনা, দলে তরুণ মেসি

২০১০ সালে ফুটবল ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি একই দলের সঙ্গে বিশ্বকাপে ছিলেন ভিন্ন ভূমিকায়। আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর তার দলের অন্যতম প্রধান তারকা ছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি।

মাঠের ফল অবশ্য আর্জেন্টিনার পক্ষে স্মরণীয় ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় দল।

তবু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে সেই বিশ্বকাপ ছিল বিশেষ। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে জাতীয় দলের দুই সবচেয়ে প্রতীকী অধিনায়কের একসঙ্গে থাকা ও কাজ করার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছিল তারা।

২০২৬: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল

ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের জয় আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কোনোদিন ভুলবেন না।

মেসি বলেছিলেন, ‘যদিও এটি মাত্র একটি ম্যাচ ছিল, আমরা কিছু বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি। সমর্থকেরা এই জয়টি অন্য যেকোনো জয়ের চেয়ে বেশি চেয়েছিল। কারণ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া এবং আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানোর অর্থই আলাদা।’

ম্যাচে দুটি গোলের সহায়তা করে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের প্রত্যাবর্তনের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের দিক থেকে দিয়েগো ম্যারাডোনার কীর্তিও ছুঁয়ে ফেলেন তিনি।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মারাদোনার বিখ্যাত ‘হাতের গোল’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোলের’ চার দশক পর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মেসির এই কীর্তি যেন ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকে।

২০২৬: স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হার মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে আরও বেদনাময় করে তোলে।

১২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন মেসি। কিন্তু টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত থেমে যায় আর্জেন্টিনা।

ফাইনালে হারলেও ৩৯ বছর বয়সে মেসির ২০২৬ বিশ্বকাপ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে রেকর্ড ভাঙা ও ইতিহাস গড়ার জন্য।

আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ বিশ্বকাপ, শেষ আন্তর্জাতিক আসর—সবকিছুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও মেসি ছিলেন নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকের চোখের সামনে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নেমেও তিনি লড়েছেন শেষ বাঁশি পর্যন্ত।

আর এভাবেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময়ের এক অসাধারণ গল্পের সমাপ্তি ঘটল—যে গল্পে ছিল হতাশা, অশ্রু, প্রত্যাবর্তন, রেকর্ড, শিরোপা এবং শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পূর্ণতা।

সংখ্যার বিচারে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়টি এমন—

# আর্জেন্টিনাকে তিনটি বড় শিরোপা জিতিয়েছেন মেসি—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা।

# আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১৮৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। গোল করেছেন ১২৫টি, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬০টি।

# ১২৫ গোলের মধ্যে ১১১টি করেছেন নিজের বিশ্বস্ত বাঁ পায়ে। ডান পায়ে ১২টি, মাথায় দুটি এবং শরীরের অন্য অংশ দিয়ে একটি গোল করেছেন।

# উত্তর আমেরিকায় এবারের বিশ্বকাপে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেসি। কিছু সময়ের জন্য শীর্ষেও উঠেছিলেন। পরে তাকে ছাড়িয়ে যান ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে মেসির গোল ২১টি, এমবাপ্পের ২২টি।

# বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নিয়েছেন মেসি—সাতটি গোল করেছেন এবং তিনটি পেনাল্টি মিস করেছেন। দুই ক্ষেত্রেই তিনি সর্বোচ্চ।

# ইতিহাসে মেসির চেয়ে বেশি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো খেলোয়াড় নেই। তিনি খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপে।

# বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলার সংখ্যাতেও মেসি সবার ওপরে—৩৪টি ম্যাচ। জয় ২৩টি, সহায়তা ১২টি এবং পেনাল্টি এলাকার বাইরে থেকে গোল ছয়টি—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেকর্ডের মালিক।

# ২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬—তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে একাদশে থেকে খেলা ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় মেসি। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী মাঠের খেলোয়াড়ও তিনি।

# পুরুষদের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও মেসির। বিশ্বকাপ, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা, গোল্ড কাপ, আফ্রিকা কাপ, এশিয়ান কাপ ও ওশেনিয়া কাপ মিলিয়ে তাঁর গোল ৩৫টি।

# ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল মেসির। বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ভিলমোস ভানচাককে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে লাল কার্ড দেখেন তিনি।

# আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি করেছেন ১১টি হ্যাটট্রিক। সর্বশেষটি এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে মেসির তুলনা

আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ১২৫ গোল ও ২০৭ ম্যাচ—দুটিই পুরুষদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে দুটিতেই মেসির ওপরে রয়েছেন।

নিজ দেশের হয়ে মেসি জিতেছেন তিনটি বড় শিরোপা—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা। রোনালদোর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা একটি—২০১৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া মেসি ২০২২ সালের ফাইনালিসিমাও জিতেছেন। অন্যদিকে রোনালদো ও পর্তুগাল জিতেছে ২০২৪-২৫ মৌসুমের উয়েফা নেশনস লিগ।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯ ম্যাচ খেলে রোনালদোর গোল মাত্র একটি, সহায়তা নেই। সেখানে মেসি ১৭ ম্যাচে করেছেন সাত গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১০টি গোল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচপ্রতি গোলের হিসাবে মেসির হার ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর রোনালদোর ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

মেসির ১২৫ আন্তর্জাতিক গোলের ২৫টি এসেছে পেনাল্টি থেকে, যা রোনালদোর চেয়ে দুটি বেশি।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছেন ১২টি। পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর এমন গোল ১১টি।

তবে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তুলনামূলকভাবে ওপরে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে গোলের হিসাবে রোনালদো কিছুটা এগিয়ে। শীর্ষ ১০ দলের বিপক্ষে মেসির গোল ১৭টি, রোনালদোর ১৮টি। শীর্ষ ২০ দলের বিপক্ষে মেসির ৩২টি, রোনালদোর ৩০টি। আর শীর্ষ ৩০ দলের বিপক্ষে মেসির ৪৯টি, রোনালদোর ৪৬টি।

সংখ্যার হিসাব যতই করা হোক, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের অধ্যায় শেষ হয়েছে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে, যা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, দেশের ফুটবল ইতিহাসেও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

আপডেট : ১০:১৫:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ার, পরিসংখ্যান ও রেকর্ড

আপডেট : ১০:১৫:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক।।

আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের ২১ বছর পর, ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী মেসি অবশ্য এর আগেও একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তার সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত বিদায়ের আবহই স্পষ্ট।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সর্বশেষ ম্যাচ ছিল ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল। ১-০ গোলে হেরে সেই ম্যাচে বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা নিখুঁত হয়নি। তবে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা ইতোমধ্যেই নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে তার অর্জন তাই দিয়েগো মারাদোনার রেখে যাওয়া কিংবদন্তির উত্তরাধিকারকে যথার্থভাবেই ধারণ করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হাতে লেখা নোটের ছবি প্রকাশ করে সোমবার আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের মাত্র দুই দিন পরই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল মেসির।

২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর থেকেই মেসি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দের অসংখ্য উপলক্ষ এনে দিয়েছেন। উপহার দিয়েছেন এমন সব স্মরণীয় মুহূর্ত ও শিরোপা, যা চিরকাল তার উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে থাকবে। আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক সোনা ও ফাইনালিসিমার শিরোপা। জাতীয় দলের জার্সিতে তাই তিনি হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী খেলোয়াড়।

আজ বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে গেলেও মেসির জাতীয় দলের হয়ে খেলা ক্যারিয়ারের সেই স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ফিরে দেখা যাক, যেগুলো তাকে চিরকাল আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের পাতায় বাঁচিয়ে রাখবে।

২০২২: অবশেষে বিশ্বকাপ জয়

ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে গনসালো মন্তিয়েল জয়সূচক পেনাল্টি করার পর মেসির হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার দৃশ্যটি কে ভুলতে পারে!

৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেন অধিনায়ক মেসি। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপাটিও যুক্ত হয় তার অর্জনের তালিকায়।

ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে করেন দুটি গোল এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার প্রথম পেনাল্টিটি জালে পাঠান। জাতীয় দলের হয়ে ১৫ বছরের বেশি সময় প্রতিনিধিত্ব করার পর অবশেষে পান কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপের স্বাদ।

২০২৬: বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি

৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি কেমন করবেন, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন ছিল। চার বছর আগে বিশ্বকাপ জিতে নিজের জন্যই তিনি যে উচ্চ মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন, তা ছিল অনেক উঁচু। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে সব সংশয় দূর করেন তিনি।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন মেসি। তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর তার গোল ছিল ১৬টি। জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যেতে প্রয়োজন ছিল আরও একটি গোলের। ম্যাচের শুরুতে পেনাল্টি মিস করলেও পরে দুটি গোল করে সেই ভুল পুষিয়ে দেন মেসি।

শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ শেষ করেন ২২ গোল নিয়ে। তবে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে মেসির ইতিহাস গড়ার মুহূর্তটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

২০১৬: চিলির কাছে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসর

সোমবারই প্রথম নয়, এর আগেও জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি।

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। ম্যাচের পর সংবাদকর্মীদের সামনে তার সেই ঘোষণা সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিল।

মেসি বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার ভাবনা এবং ড্রেসিংরুমে বসে ভাবার পর মনে হচ্ছে, জাতীয় দলের হয়ে আমার খেলা শেষ।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এটি ছিল চারটি ফাইনাল, কিন্তু কোনোটি জিততে পারিনি। সম্ভব সবকিছুই করেছি। অন্য সবার চেয়ে এই পরাজয় আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। কিন্তু স্পষ্টতই এটা আমার জন্য নয়। জাতীয় দলের হয়ে একটি শিরোপা জিততে আমিই সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি।’

তবে পরে ফিরে আসেন মেসি। এরপর টানা দুটি কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি একের পর এক ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়েন।

২০০৬: বিশ্বকাপে অভিষেক

২০০৬ সালের ১৬ জুন বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির আগমনের দিন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ১৮ বছর বয়সী মেসি ৭৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন।

মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোল করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি। ম্যাচে একটি গোল ও একটি সহায়তা করেন মেসি। আর্জেন্টিনা জেতে ৬-০ গোলে।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সেটিই ছিল মেসির উপহার দেওয়া অসংখ্য আনন্দের মুহূর্তের প্রথমটি।

২০২২: মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য গোল

কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে মেসির সেই দুর্দান্ত গোলটি না হলে আর্জেন্টিনার গল্পটি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হেরে গেলে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় ছিল আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া হয়ে জয়ের পথ খুঁজছিল আর্জেন্টিনা।

অবশেষে ৬৪ মিনিটে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে জাল কাঁপান মেসি। তার সেই গোল আর্জেন্টিনাকে অনুপ্রাণিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় পায় দলটি। সেই জয়ই পরবর্তী সময়ে বিশ্বকাপ জয়ের পথে বড় ভূমিকা রাখে।

২০১৪: জার্মানির কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার

২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেন মেসি। প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি।

ম্যাচে আর্জেন্টিনা কঠিন লড়াই করলেও অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের গোল ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। আর্জেন্টিনা হারলেও পুরো আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য মেসি জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

সাত ম্যাচে চার গোল ও একটি সহায়তা করেছিলেন তিনি।

সেই পরাজয়ের পরই মেসি আরও শক্তভাবে ফিরে এসে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আট বছর পর সেই প্রতিজ্ঞা পূরণও করেন।

২০২১: কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার শিরোপা-খরা কাটানো

২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে ২০২১ সালে অধিনায়ক হিসেবে কোপা আমেরিকার শিরোপা হাতে তোলেন মেসি।

রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটায় আর্জেন্টিনা।

মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে মেসির গল্পটাও যেন বদলে যায়। যে কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা তাঁকে একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, সেই প্রতিযোগিতার শিরোপাই শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে ওঠে।

২০০৫: অভিষেকের পরই লাল কার্ড

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় ১৮ বছর বয়সী মেসির।

তবে অভিষেকটি ছিল তিক্ত-মধুর। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সরাসরি লাল কার্ড দেখেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও স্বপ্নের মতো ছিল না। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে সেই লাল কার্ডের স্মৃতি বহু আগেই মুছে দিয়েছেন মেসি।

২০১০: কোচ ম্যারাডোনা, দলে তরুণ মেসি

২০১০ সালে ফুটবল ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি একই দলের সঙ্গে বিশ্বকাপে ছিলেন ভিন্ন ভূমিকায়। আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর তার দলের অন্যতম প্রধান তারকা ছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি।

মাঠের ফল অবশ্য আর্জেন্টিনার পক্ষে স্মরণীয় ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় দল।

তবু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে সেই বিশ্বকাপ ছিল বিশেষ। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে জাতীয় দলের দুই সবচেয়ে প্রতীকী অধিনায়কের একসঙ্গে থাকা ও কাজ করার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছিল তারা।

২০২৬: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল

ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের জয় আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কোনোদিন ভুলবেন না।

মেসি বলেছিলেন, ‘যদিও এটি মাত্র একটি ম্যাচ ছিল, আমরা কিছু বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি। সমর্থকেরা এই জয়টি অন্য যেকোনো জয়ের চেয়ে বেশি চেয়েছিল। কারণ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া এবং আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানোর অর্থই আলাদা।’

ম্যাচে দুটি গোলের সহায়তা করে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের প্রত্যাবর্তনের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের দিক থেকে দিয়েগো ম্যারাডোনার কীর্তিও ছুঁয়ে ফেলেন তিনি।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মারাদোনার বিখ্যাত ‘হাতের গোল’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোলের’ চার দশক পর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মেসির এই কীর্তি যেন ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকে।

২০২৬: স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হার মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে আরও বেদনাময় করে তোলে।

১২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন মেসি। কিন্তু টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত থেমে যায় আর্জেন্টিনা।

ফাইনালে হারলেও ৩৯ বছর বয়সে মেসির ২০২৬ বিশ্বকাপ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে রেকর্ড ভাঙা ও ইতিহাস গড়ার জন্য।

আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ বিশ্বকাপ, শেষ আন্তর্জাতিক আসর—সবকিছুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও মেসি ছিলেন নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকের চোখের সামনে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নেমেও তিনি লড়েছেন শেষ বাঁশি পর্যন্ত।

আর এভাবেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময়ের এক অসাধারণ গল্পের সমাপ্তি ঘটল—যে গল্পে ছিল হতাশা, অশ্রু, প্রত্যাবর্তন, রেকর্ড, শিরোপা এবং শেষ পর্যন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পূর্ণতা।

সংখ্যার বিচারে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়টি এমন—

# আর্জেন্টিনাকে তিনটি বড় শিরোপা জিতিয়েছেন মেসি—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা।

# আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১৮৫টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। গোল করেছেন ১২৫টি, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৬০টি।

# ১২৫ গোলের মধ্যে ১১১টি করেছেন নিজের বিশ্বস্ত বাঁ পায়ে। ডান পায়ে ১২টি, মাথায় দুটি এবং শরীরের অন্য অংশ দিয়ে একটি গোল করেছেন।

# উত্তর আমেরিকায় এবারের বিশ্বকাপে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেসি। কিছু সময়ের জন্য শীর্ষেও উঠেছিলেন। পরে তাকে ছাড়িয়ে যান ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে মেসির গোল ২১টি, এমবাপ্পের ২২টি।

# বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি নিয়েছেন মেসি—সাতটি গোল করেছেন এবং তিনটি পেনাল্টি মিস করেছেন। দুই ক্ষেত্রেই তিনি সর্বোচ্চ।

# ইতিহাসে মেসির চেয়ে বেশি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো খেলোয়াড় নেই। তিনি খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপে।

# বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলার সংখ্যাতেও মেসি সবার ওপরে—৩৪টি ম্যাচ। জয় ২৩টি, সহায়তা ১২টি এবং পেনাল্টি এলাকার বাইরে থেকে গোল ছয়টি—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেকর্ডের মালিক।

# ২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬—তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে একাদশে থেকে খেলা ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় মেসি। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী মাঠের খেলোয়াড়ও তিনি।

# পুরুষদের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও মেসির। বিশ্বকাপ, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা আমেরিকা, গোল্ড কাপ, আফ্রিকা কাপ, এশিয়ান কাপ ও ওশেনিয়া কাপ মিলিয়ে তাঁর গোল ৩৫টি।

# ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল মেসির। বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ভিলমোস ভানচাককে কনুই দিয়ে আঘাত করার অভিযোগে লাল কার্ড দেখেন তিনি।

# আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি করেছেন ১১টি হ্যাটট্রিক। সর্বশেষটি এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে মেসির তুলনা

আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ১২৫ গোল ও ২০৭ ম্যাচ—দুটিই পুরুষদের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে দুটিতেই মেসির ওপরে রয়েছেন।

নিজ দেশের হয়ে মেসি জিতেছেন তিনটি বড় শিরোপা—২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা। রোনালদোর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা একটি—২০১৬ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া মেসি ২০২২ সালের ফাইনালিসিমাও জিতেছেন। অন্যদিকে রোনালদো ও পর্তুগাল জিতেছে ২০২৪-২৫ মৌসুমের উয়েফা নেশনস লিগ।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯ ম্যাচ খেলে রোনালদোর গোল মাত্র একটি, সহায়তা নেই। সেখানে মেসি ১৭ ম্যাচে করেছেন সাত গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১০টি গোল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচপ্রতি গোলের হিসাবে মেসির হার ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর রোনালদোর ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

মেসির ১২৫ আন্তর্জাতিক গোলের ২৫টি এসেছে পেনাল্টি থেকে, যা রোনালদোর চেয়ে দুটি বেশি।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছেন ১২টি। পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর এমন গোল ১১টি।

তবে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তুলনামূলকভাবে ওপরে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে গোলের হিসাবে রোনালদো কিছুটা এগিয়ে। শীর্ষ ১০ দলের বিপক্ষে মেসির গোল ১৭টি, রোনালদোর ১৮টি। শীর্ষ ২০ দলের বিপক্ষে মেসির ৩২টি, রোনালদোর ৩০টি। আর শীর্ষ ৩০ দলের বিপক্ষে মেসির ৪৯টি, রোনালদোর ৪৬টি।

সংখ্যার হিসাব যতই করা হোক, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের অধ্যায় শেষ হয়েছে এমন এক উত্তরাধিকার রেখে, যা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, দেশের ফুটবল ইতিহাসেও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।