তিন দপ্তরের তিন হিসাব, দায় নিচ্ছে না কেউ মেহেরপুরের ইটভাটা; রাজস্ব আর ছাড়পত্রের জটলা

তোজাম্মেল আযম ।।
মেহেরপুর জেলার ইটভাটাগুলো যেন একই আগুনে পোড়ানো হলেও রাষ্ট্রের কাছে তাদের পরিচয় এক নয়। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজস্ব (কাস্টমস) বিভাগ তিন দপ্তরের তিন রকম হিসাব, তিন রকম অবস্থান। এর ফাঁকে নির্বিঘ্নে চলেছে অধিকাংশ অবৈধ ইটভাটা, আর দায়ের ভার পড়ছে পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।
জেলা প্রশাসনের নথিতে ইটভাটার সংখ্যা ১০৩টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে তা ১১৩টি। অথচ রাজস্ব বিভাগের হিসাবে ভাটার সংখ্যা মাত্র ৬৮টি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ১১৩ ভাটার মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে ৭৮টি ইটভাটা, যার মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে মাত্র দুটি ভাটার। বাকি ভাটাগুলো কীভাবে বছরের পর বছর উৎপাদনে রয়েছে- সেই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট নয়। ছাড়পত্র নেই, তবু রাজস্ব আদায় হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শেখ কামাল মেহেদি স্বীকার করেন, ছাড়পত্র না থাকা সত্ত্বেও ইটভাটা থেকে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এতে এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, যা পরিবেশ আইনের পরিপন্থী। তবে প্রশ্ন উঠেছে— যদি ভাটাগুলো অবৈধ হয়, তাহলে সেগুলো থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে কীভাবে? রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, চলতি অর্থবছরে ইটভাটা খাত থেকে ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার কারণে ভাটা মালিকেরা রাজস্ব প্রদানে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
ভাটা মালিকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, বিভিন্ন সরকারি দিবস ও প্রশাসনিক কর্মসূচি পালনে জেলা প্রশাসন নিয়মিতভাবে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়। অথচ একই প্রশাসন আবার পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে মোটা অঙ্কের জরিমানা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভাটা মালিক বলেন, আমরা নিয়ম মেনে ছাড়পত্র নিতে চাই। আবেদন করেছি। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই বলা হয়, আবার কী লাগবে তাও স্পষ্ট করে বলা হয় না। এভাবে ছাড়পত্র না দিয়ে আমাদের অবৈধ বানিয়ে রাখা হচ্ছে।
ছাড়পত্র ছাড়া ভাটা চালু থাকলে কীভাবে নিয়মিত উৎপাদন চলছে? ছাড়পত্রবিহীন ভাটা থেকে ভ্যাট আদায় বন্ধে কেন উদ্যোগ নেই? চলতি মাসে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও কাস্টমস বিভাগের যৌথ অভিযানে ১০টি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অভিযানের পরপরই ইটের বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, কয়েকটি ইটভাটায় জরিমানার অজুহাতে প্রতি হাজার ইটে দাম বাড়ানো হয়েছে ২ হাজার টাকা করে। এক নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবসায়ী বলেন, আইনের ব্যর্থতার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। জরিমানা হয় ভাটায়, দাম বাড়ে ইটের বাজারে।
জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় ইটভাটার বৈধতা, ছাড়পত্র ও রাজস্ব আদায় নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত আসেনি। পরিবেশ রক্ষা না রাজস্ব আদায়— কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, সেই নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দপ্তরগুলোর এই দ্বৈতনীতি ইটভাটাগুলোকে আইনের ফাঁক গলে টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে। আর সেই ফাঁকে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, দূষিত হচ্ছে বাতাস, বাড়ছে নির্মাণ ব্যয়। মেহেরপুরের ইটভাটার চুল্লিতে শুধু ইট নয়— পুড়ছে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা, আইনের শাসন আর জনস্বার্থ। প্রশ্ন, এই আগুন নেভাবে কে?
পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকলে ভাটা নিবন্ধন বৈধ হয় কীভাবে? অবৈধ ভাটা থেকে রাজস্ব আদায় কি পরোক্ষ বৈধতা নয়? ইটভাটা মালিক সমিতি আইনগত মর্যাদা নেই (স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন)। জরিমানার অজুহাতে ইটের দাম বাড়ানো কতটা ন্যায্য? একটি ইটভাটা যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের চোখে অবৈধ হয়, কিন্তু রাজস্ব বিভাগের খাতায় বৈধ করদাতা হয় তাহলে সেটি আইনসম্মত না অবৈধ? এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে মেহেরপুরের ইটভাটার ধোঁয়ার সঙ্গে আইনের শাসনও ক্রমেই মিলিয়ে যাবে।
ইটভাটাছাড়পত্রজটলামেহেরপুররাজস্ব
Share
Tweet
Share
Pin
Share
0Shares
মেহেরপুরে জামায়াতের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
চাঁদবাজদের পুনর্বাসন নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো
নিজস্ব প্রতিবেদক 88 ১৩ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ · রাত ১:১২ image_print
মেহেরপুরে জামায়াতের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন নয়, বরং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তাদের চাঁদাবাজিতে জড়াতে না হয়।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত মেহেরপুর-১ আসনের প্রার্থী তাজ উদ্দিন খান এবং মেহেরপুর-২ আসনের প্রার্থী নাজমুল হুদার সমর্থনে এই জনসভার আয়োজন করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মেহেরপুর ছোট জেলা, মাত্র তিনটি উপজেলা। মানুষ একে অপরকে চেনে। অথচ এই জেলাও চাঁদাবাজদের দখলে চলে গেছে। জনগণের রায়ে আমরা ক্ষমতায় এলে এই মানুষগুলোর দায়িত্ব আমরা নেব। তাদের কাজ দেব, যাতে চাঁদাবাজি করতে না হয়।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামি। আমাদের প্রথম ভোট হবে হ্যাঁ ভোট। সবাই হ্যাঁ ভোট নিশ্চিত করলে দেশ বিজয়ী হবে। ভোটের দিন কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। কেউ ভোট ডাকাতি করতে এলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
গত ৫৪ বছরের শাসকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে দেশে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়নি। তরুণ সমাজ মাদক ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের জন্য আমাদের মায়া হয়। দায়িত্ব পেলে দেশকে ফুলের মতো সাজাবো, যাতে মানুষ দেশ নিয়ে গর্ব করতে পারে।’
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজি করবো না, দুর্নীতি করবো না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয়ও দেবো না। মানুষ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে কাকে ভোট দেবে।’
বেকার ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বেকার ভাতা দেবো না, রাষ্ট্রের টাকা থাকলেও না। ভাতা দিলে বেকারত্ব কমে না, বরং বাড়ে। আমরা ভাতা নয়, কাজ দেবো।’
তিনি আরও বলেন, তরুণদের শক্তিতেই দেশ এগিয়ে যাবে। সেই লক্ষ্যেই যুব সমাজকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জনসভা শেষে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান মেহেরপুরের দুইটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন এবং উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সহযোগিতা কামনা করেন।
সমাবেশে মেহেরপুর জেলার জামায়াত ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সমাবেশ স্থল কানাই কানাই পূর্ণ হয়ে যায়। সমাবেশ মঞ্চে এনসিপির নেতৃবৃন্দসহ ১০ দলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।




















