চুয়াডাঙ্গা ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নগর প্রশাসনের উদাসীনতায় মশার প্রজননস্থল ঢাকা

Padma Sangbad
৪৭

অনলাইন ডেস্ক।।
নামাজের ঘর, পড়ার টেবিল, দোকান, হাটবাজার, অফিস-আদালত; সবখানেই এখন কিউলেক্স মশার দাপট। সকাল, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাত – কোনো সময়ই রেহাই মিলছে না। এই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। কবে কমবে এই উপদ্রব, তার স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই নগর কর্তৃপক্ষের কাছে। ঝড়-বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না – এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মশা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। মরণঘাতী এডিসের পাশাপাশি এবার কিউলেক্স মশার উপদ্রবও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় সব এলাকায় মশার উৎপাত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও মাঝেমধ্যে লোকদেখানো ফগিং কার্যক্রম চোখে পড়ে; বিশেষজ্ঞদের মতে এ পদ্ধতি কার্যকর নয়। এতে মশা দমনে তেমন ফল মেলে না, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থ অপচয় বাড়ে।

নগরবাসীর অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিহীন সিটি করপোরেশনে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় ও তদারকি কমে গেছে। দীর্ঘদিনের আমলানির্ভর ব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও দুর্বল হয়েছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন খাতে অব্যবস্থাপনা প্রকট হয়েছে।

রাজধানীর গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, উন্নতমানের কীটনাশক প্রয়োগ করলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভবÑ তারা তার প্রমাণ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহায়তায় গুলশান লেকে বিটিআই প্রয়োগ করে ছয় মাস মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এখন পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়েছে। তার অভিযোগ, জবাবদিহিতার অভাবেই বছরের পর বছর অনিয়ম ও অপচয় চলেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগে. জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের দেশে পরিচ্ছন্ন নগরী ছাড়া সমস্যা নির্মূল করা একেবারেই অসম্ভব। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, নালা-নর্দমা ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব। নাগরিকদের সচেতনতা দরকার। যেকোনো ড্রেন নালা-ডোবা-খাল-বিল পরিষ্কার করার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সেই অবস্থায় চলে যায়।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু একটি পদ্ধতি দিয়ে কাজ হবে না। কীটনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন, নালা, নর্দমা ও ডোবা পরিষ্কার করতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন এবং সম্পৃক্ত হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ না করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, বহু পুরনো ফগিং পদ্ধতি এখন প্রায় অকার্যকর; এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে কিউলেক্স মশার বিস্তার বাড়তে শুরু করে, যা ফেব্রুয়ারি-মার্চে চরমে ওঠে। এ সময়ে বৃষ্টিপাত কম থাকায় ডোবা-নালায় পানি জমে পচে যায়, যা মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। শীত শেষে উষ্ণ আবহাওয়াও মশা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই এই সময়ে বিশেষ নজরদারি জরুরি।

সাধারণত তিনভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হয়Ñ লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও জৈবিক পদ্ধতি। লার্ভিসাইডিংয়ের মাধ্যমে জমে থাকা পানিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে লার্ভা ধ্বংস করা হয়। ফগিংয়ের মাধ্যমে উড়ন্ত মশা মারার চেষ্টা করা হয়, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জৈবিক পদ্ধতিতে বিটিআই বা উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো উপাদান ব্যবহার করে মশার প্রজনন কমানো হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক কোনো পদ্ধতি নয়; সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

অন্যদিকে, ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে নারাজ নগর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বলেন, এসময় কিউলেক্স মশা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। নালা-ডোবায় পানিপ্রবাহ না থাকায় প্রজনন বাড়ছে। তারা নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মিরপুরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, বাস্তবে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। এত মশা যে কোথাও দাঁড়ানো যায় না। এখনকার মশা আকারেও বড়। অভিযোগ জানালেও কার্যকর ফল পাওয়া যায় না।

নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে সমাধান হবে না; নিয়মিত ড্রেন-নালা পরিষ্কার ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

মশা নিধন চেয়ে ডিএনসিসির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নোটিশ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মশার উপদ্রব বন্ধ ও মশা নিধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংস্থাটির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনী নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল রবিবার আইনজীবী এইচ এম রাশদুল ইসলাম (রাশেদ) ডাকযোগে নোটিশটি পাঠান। এতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মশা নিধনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন করা হবে।

আপডেট : ০৫:০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নগর প্রশাসনের উদাসীনতায় মশার প্রজননস্থল ঢাকা

আপডেট : ০৫:০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৪৭

অনলাইন ডেস্ক।।
নামাজের ঘর, পড়ার টেবিল, দোকান, হাটবাজার, অফিস-আদালত; সবখানেই এখন কিউলেক্স মশার দাপট। সকাল, সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাত – কোনো সময়ই রেহাই মিলছে না। এই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী। কবে কমবে এই উপদ্রব, তার স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই নগর কর্তৃপক্ষের কাছে। ঝড়-বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না – এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মশা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। মরণঘাতী এডিসের পাশাপাশি এবার কিউলেক্স মশার উপদ্রবও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় সব এলাকায় মশার উৎপাত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও মাঝেমধ্যে লোকদেখানো ফগিং কার্যক্রম চোখে পড়ে; বিশেষজ্ঞদের মতে এ পদ্ধতি কার্যকর নয়। এতে মশা দমনে তেমন ফল মেলে না, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থ অপচয় বাড়ে।

নগরবাসীর অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিহীন সিটি করপোরেশনে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় ও তদারকি কমে গেছে। দীর্ঘদিনের আমলানির্ভর ব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও দুর্বল হয়েছে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন খাতে অব্যবস্থাপনা প্রকট হয়েছে।

রাজধানীর গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, উন্নতমানের কীটনাশক প্রয়োগ করলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভবÑ তারা তার প্রমাণ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহায়তায় গুলশান লেকে বিটিআই প্রয়োগ করে ছয় মাস মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এখন পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়েছে। তার অভিযোগ, জবাবদিহিতার অভাবেই বছরের পর বছর অনিয়ম ও অপচয় চলেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগে. জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের দেশে পরিচ্ছন্ন নগরী ছাড়া সমস্যা নির্মূল করা একেবারেই অসম্ভব। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, নালা-নর্দমা ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাব। নাগরিকদের সচেতনতা দরকার। যেকোনো ড্রেন নালা-ডোবা-খাল-বিল পরিষ্কার করার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সেই অবস্থায় চলে যায়।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু একটি পদ্ধতি দিয়ে কাজ হবে না। কীটনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেন, নালা, নর্দমা ও ডোবা পরিষ্কার করতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন এবং সম্পৃক্ত হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ না করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি আরও বলেন, বহু পুরনো ফগিং পদ্ধতি এখন প্রায় অকার্যকর; এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি থেকে কিউলেক্স মশার বিস্তার বাড়তে শুরু করে, যা ফেব্রুয়ারি-মার্চে চরমে ওঠে। এ সময়ে বৃষ্টিপাত কম থাকায় ডোবা-নালায় পানি জমে পচে যায়, যা মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। শীত শেষে উষ্ণ আবহাওয়াও মশা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই এই সময়ে বিশেষ নজরদারি জরুরি।

সাধারণত তিনভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হয়Ñ লার্ভিসাইডিং, ফগিং ও জৈবিক পদ্ধতি। লার্ভিসাইডিংয়ের মাধ্যমে জমে থাকা পানিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে লার্ভা ধ্বংস করা হয়। ফগিংয়ের মাধ্যমে উড়ন্ত মশা মারার চেষ্টা করা হয়, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জৈবিক পদ্ধতিতে বিটিআই বা উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো উপাদান ব্যবহার করে মশার প্রজনন কমানো হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক কোনো পদ্ধতি নয়; সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

অন্যদিকে, ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে নারাজ নগর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বলেন, এসময় কিউলেক্স মশা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। নালা-ডোবায় পানিপ্রবাহ না থাকায় প্রজনন বাড়ছে। তারা নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মিরপুরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, বাস্তবে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চোখে পড়ে না। এত মশা যে কোথাও দাঁড়ানো যায় না। এখনকার মশা আকারেও বড়। অভিযোগ জানালেও কার্যকর ফল পাওয়া যায় না।

নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে সমাধান হবে না; নিয়মিত ড্রেন-নালা পরিষ্কার ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

মশা নিধন চেয়ে ডিএনসিসির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নোটিশ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মশার উপদ্রব বন্ধ ও মশা নিধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংস্থাটির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনী নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল রবিবার আইনজীবী এইচ এম রাশদুল ইসলাম (রাশেদ) ডাকযোগে নোটিশটি পাঠান। এতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মশা নিধনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট আবেদন করা হবে।