শাহজালালে সেবায় ধস, দায় এড়াচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা

অনলাইন ডেস্ক।।
দেশের আকাশপথের প্রধান প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ উঠছে। ফ্লাইট নামলেই ট্রলির জন্য হুড়োহুড়ি, আগমনী টার্মিনালে লাগেজ নিতে ধাক্কাধাক্কি, ক্যানোপি এলাকায় মশার ঝাঁক- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানের সেবার বদলে এক ধরনের অঘোষিত বিশৃঙ্খলার চিত্র ফুটে উঠছে। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার যাত্রী এবং তাদের স্বজনসহ আরও প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের পদচারণায় মুখর এই বিমানবন্দরে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দেশি-বিদেশি ভ্রমণকারীরা। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নেই এবং নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রায় ৩০টি এয়ারলাইন্সের দেড় শতাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এখানে ওঠানামা করে। গড়ে
যাত্রীসংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার। অথচ ট্রলির সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৬০০। একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করলে ট্রলি সংকট তীব্র হয়। বিশেষ করে ভোর ও গভীর রাতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে ফ্লাইট এলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি আগমনী টার্মিনালের ৫ নম্বর লাগেজ বেল্টের সামনে শতাধিক যাত্রীকে ট্রলির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল ৬টা ৯ মিনিটে একসঙ্গে ২০-২৫টি ট্রলি আনা হলে শুরু হয় টানাটানি ও ধাক্কাধাক্কি। চিৎকার-চেঁচামেচি এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। যাত্রীদের ভাষায়, এটি যেন নিত্যদিনের ‘ট্রলি যুদ্ধ’।
শুধু যাত্রী নয়, তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় ভোগান্তি বাড়ে। অনেকেই কনকোর্স হলের বাইরে ও দ্বিতীয় তলার ড্রাইভওয়েতে অতিরিক্ত টয়লেট স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরা প্রবাসী রুবেল বলেন, সারারাত ভ্রমণের পর আধা ঘণ্টা ট্রলির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। মানুষ মারামারি করছেÑ এভাবে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চলতে পারে না। বিদেশের বিমানবন্দরগুলোতে ট্রলি সহজেই পাওয়া যায়, অথচ দেশের প্রধান বিমানবন্দরে এমন অভিজ্ঞতা হতাশাজনক।
নোয়াখালীর যাত্রী ইউসুফ বলেন, বয়স্করা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েন। ভারী লাগেজ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়েন। যাত্রীপ্রবাহ জানা সত্ত্বেও কেন ট্রলির সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে না-এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সমস্যা শুধু ট্রলি সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। টার্মিনাল-১ ও ২-এর ক্যানোপি অংশে ট্রলি বের হওয়ার পথে প্রায় দেড় ফুট উঁচু স্টিলের বেড়া বসানো হয়েছে। নিরাপত্তার যুক্তি দেখানো হলেও এতে ভোগান্তি বেড়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। অনেককে কাঁধে বা মাথায় লাগেজ তুলে বাইরে যেতে দেখা যায়। লাগেজ পেতেও নিয়মিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, বিদেশি অতিথিদের নিতে এলে বিব্রত হতে হয়। তারা প্রশ্ন করেন, ট্রলি নিয়ে বাইরে যাওয়া যায় না কেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে মশার উৎপাত নিয়েও রয়েছে তীব্র অভিযোগ। বহির্গমন বিভাগের দ্বিতীয় তলার ক্যানোপিতে স্বজনদের বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকেই মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হন। যাত্রীদের দাবি, আগমনী টার্মিনাল, ক্যানোপি, এমনকি রানওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকাতেও মশার উপস্থিতি বেড়েছে। কোনো কোনো সময় মশা উড়োজাহাজের কেবিনেও ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
লন্ডন থেকে ফেরা সিলেটের আজিজুল বলেন, বিমানবন্দরে নামলে মনে হয় মাছের বাজারে এসেছি। মশা-মাছির উপদ্রব লজ্জাজনক। একটি দেশের প্রথম ইমপ্রেশন তৈরি হয় বিমানবন্দরেইÑ এমন পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বলেন, মশাসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি তার জানা নেই। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং টার্মিনালের ভেতরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্রলি সংকটের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, প্রতিদিন সকাল-বিকাল মশার ওষুধ ছিটানো হয়। তবে শুষ্ক মৌসুমে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। বিমানবন্দরের বাইরের মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওপর বলে জানানো হয়েছে।




















