চুয়াডাঙ্গা ০১:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই আন্দোলন : ছেলে তায়িম হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন পুলিশ কর্মকর্তা

Padma Sangbad
৮৮

অনলাইন ডেস্ক।।

জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীতে শহীদ ইমাম হাসান তায়িম হত্যার মামলায় সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তায়িমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন। আজ বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অংশগ্রহণ করেছিল। আমার জানামতে, সে ২০২৪ সালের ১৫-১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

সাক্ষী ময়নাল হোসেন বলেন, ওই বছরের ২০ জুলাই আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়া আনুমানিক দুপুর ১২টায় তার বন্ধু শাহরিয়ারের ফোনকল পেয়ে বাসা থেকে চা খাওয়ার কথা বলে বের হয়। পরে সে তার বন্ধু শাহরিয়ার ও রাহাত কাজলা এলাকায় অবস্থান নেয়। আনুমানিক দুপুর ১টার সময় আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থানকালে আমার স্ত্রীর ছোট বোন শাহিদা আক্তার আমার ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি, তুমি কাঁদো কেন? সে বলে, আমার আদরের সোনামনি তায়িমকে কাজলা ফুটওভার ব্রিজে গুলি করে ফেলে রেখেছে। এ কথা শুনে আমিও কান্নাকাটি শুরু করলাম। পরবর্তীতে আমার সহকর্মী আমাকে সান্ত্বনা দেয়। পরে আমি শাহিদাকে বলি, তায়িমের কী অবস্থা? সে বলল, একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমি শাহিদাকে বললাম, তুমি তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাও। পরবর্তীতে আমার ছেলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবগত করি। কর্তৃপক্ষ আমাকে ১০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেন।

জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন আরও বলেন, আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে শাহিদার সঙ্গে আমার দেখা হলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আমার ছেলের কী খবর? সে বলল, সে কয়েকটি ওয়ার্ডে তায়িমকে খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। পরবর্তীতে আমরা দুজন একসঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও ইমার্জেন্সিতে খুঁজতে থাকি। কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাই। এমন সময় একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করে আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? আমি বললাম, ‘ভাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। আমি কোথাও খুঁজে পাইনি।’ ওই সাংবাদিক আমার কাছে আমার ছেলের ছবি দেখতে চান এবং আমি তাকে আমার ছেলের ছবি দেখাই।’ এরপর ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আমার মোবাইলে কিছু মৃত ব্যক্তির ছবি আছে, দেখেন সেখানে আপনার ছেলের ছবি আছে কি না?’ তখন তার মোবাইল থেকে মৃত ব্যক্তিদের ছবি দেখালে আমি আমার ছেলেকে মৃত অবস্থায় শনাক্ত করি। তখন সে বলল, ‘মর্গে কিছু বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে, সেখানে আপনি দেখতে পারেন।’

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী ময়নাল হোসেন বলেন, আমি মর্গের উদ্দেশে রওনা করলে সিকিউরিটি গার্ড (নিরাপত্তা রক্ষী) আমাকে বাধা দেয়। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বলি, ‘আমি একজন পুলিশ সদস্য। যাত্রাবাড়ী এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার লাশ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’ তখন সিকিউরিটি গার্ড আমাকে মর্গে যেতে দেয়। মর্গে গিয়ে দেখি প্রায় ২০ থেকে ৩০টি লাশ পড়ে আছে। আমি বারবার আমার ছেলের লাশ খুঁজতে থাকি, কিন্তু খুঁজে পাইনি। তারপর আরও বিভিন্ন মর্গে যাই, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি।

শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন আরও বলেন, পরবর্তীতে নতুন বিল্ডিংয়ের ইমার্জেন্সির মর্গে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে আমার ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। সেখানে আরও অনেক লাশ ছিল। আমার ছেলের লাশ পেয়ে আমি এবং আমার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার দুজনে কান্নাকাটি করতে থাকি। সেখানে অনেক সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক আসে। আমার ছেলের লাশের ওপরে, বুকে, পেটে ও পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমি সেখানে থাকা সাংবাদিকদের বলি, ‘একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে?’ পরবর্তীতে মর্গ থেকে বের হয়ে আসি।

জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন বলেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে আমার দুজন সহকর্মী ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমার কাছে আসে এবং আমাকে সান্ত্বনা দেয়। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নেওয়ার জন্য শাহবাগ থানায় গিয়ে কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক রাত ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই।

ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমাকে বলে, আমরা শাহবাগ থানায় গিয়ে জানতে পেরেছি, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের দায়িত্ব শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতকে দিয়েছে। আমি এসআই শাহদাত কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, এসআই শাহদাত থানায় আছে। আমার সহকর্মীরা আমাকে জানান, এসআই শাহদাত বলেছে, সেদিন সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের সময় শেষ হয়ে গেছে, পরের দিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) হবে। তখন আমরা মর্গের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমার সহকর্মীরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যাই। আমার শ্যালিকা নিজ বাড়িতে যায় এবং আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থান করি। আমার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে তখন পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে অবগত করা হয়নি, কারণ সে অসুস্থ ছিল এবং এই সংবাদ শুনলে তার আরও অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা ছিল।

সাক্ষীর জবানবন্দিতে শহীদ তায়িমের বাবা আরও বলেন, পরের দিন ২১ জুলাই ২০২৪ আনুমানিক সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার সময় পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করি। মর্গে থেকে আমার ছেলের লাশ নিয়ে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানা থেকে এসআই শাহদাত এলে আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাকে আমার পরিচয় দেই এবং বলি, ‘আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে, দয়া করে দ্রুত সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেন।’ তিনি আমাকে দেখে কোন কথা না বলে অন্য একজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। পরবর্তীতে এসআই শাহদাত তার অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলেন এবং ব্যক্তিগত কাজ করতে থাকেন। এসআই শাহদাত অকারণে দেরি করতে থাকেন। আনুমানিক দুপুর ১২টার সময় এসআই শাহদাত সুরতহাল করার জন্য যান। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলির চিহ্নগুলো না লেখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লেখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন?’ এসআই শাহদাত আমাকে বলল, ‘এটা ওপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না।’ এসআই শাহদাত আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে।’ এই বলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। আমার ছেলে মারা গেছে এবং চাকরি হারানোর সম্ভাবনা আছে এবং ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে। এই চিন্তা করে আমি সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, পোস্টমর্টেম করাতে পারছি না। এসআই শাহদাত আমাদের কাছে দুই-তিনবার এলে তাকে অনুরোধ করি, আমার ছেলের ময়নাতদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু এসআই শাহদাত কোনো সহযোগিতা করেননি। পরবর্তীতে আনুমানিক বিকেল ৪টার সময় তায়িমের লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। আনুমানিক বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ছেলের পোস্টমর্টেম শেষে আমরা লাশ বুঝে পাই। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নিয়ে আমার সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যাই এবং গোসল করানোর জন্য প্রস্তুতি নিই। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সহকারী ইমাম পুলিশের উপপরিদর্শক (এএসআই) জাহাঙ্গীর ও তার দুজন সহকর্মী এবং আমার একজন আত্মীয় মুফতি হায়দার বিন সাদের গোসল করায়। আমার ছেলের লাশের কোমড়ের বাম পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারি, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন আরও বলেন, গোসল শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে প্রথম জানাজা শেষ করে আত্মীয়স্বজনসহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা করি। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় দ্বিতীয় জানাজা শেষ করে পারিবারিক গোরস্থানে ছেলের লাশের দাফন সম্পন্ন করি।

পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল বলেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই আমি ঢাকায় আসি। তায়িমের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যান্যদের কাছে শুনতে পাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আমার ছেলে তায়িম প্রতিদিন আন্দোলনে যোগ দিত। তার বন্ধুদের কাছে শুনেছি, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। ঘটনার সময় তায়িম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির হোসেন, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন পুলিশ আমার ছেলে তায়িম ও তার বন্ধুদেরকে চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করলে কোন দিকে যেতে না পেরে আমার ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং চায়ের দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায়। পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে বের করে লাঠি, রাইফেলের বাট দিয়ে অনেক মারতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। আমার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে। আমার ছেলে ‘মা… মা…’ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তায়িমকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে ‘মা… মা…’ করে কাঁদতে থাকে। একটি গুলি রাহাতের পায়ে লাগে। রাহাত তার জীবন বাঁচাতে আমার ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার ছেলে সেখানে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে তায়িমের আরেক বন্ধু শাহরিয়ার ও চা দোকানদার লিটন আমার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইন্সপেক্টর জাকির, ইন্সপেক্টর মামুন, এসআই সাজ্জাদ বাধা দেয়। আমার ছেলে অনেকক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে আমার ছেলেকে একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।-এনটিভি

আপডেট : ১০:০৯:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

জুলাই আন্দোলন : ছেলে তায়িম হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন পুলিশ কর্মকর্তা

আপডেট : ১০:০৯:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
৮৮

অনলাইন ডেস্ক।।

জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ীতে শহীদ ইমাম হাসান তায়িম হত্যার মামলায় সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দিতে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তায়িমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন। আজ বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অংশগ্রহণ করেছিল। আমার জানামতে, সে ২০২৪ সালের ১৫-১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ী কাজলা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

সাক্ষী ময়নাল হোসেন বলেন, ওই বছরের ২০ জুলাই আমার ছেলে ইমাম হাসান তায়িম ভূঁইয়া আনুমানিক দুপুর ১২টায় তার বন্ধু শাহরিয়ারের ফোনকল পেয়ে বাসা থেকে চা খাওয়ার কথা বলে বের হয়। পরে সে তার বন্ধু শাহরিয়ার ও রাহাত কাজলা এলাকায় অবস্থান নেয়। আনুমানিক দুপুর ১টার সময় আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থানকালে আমার স্ত্রীর ছোট বোন শাহিদা আক্তার আমার ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি, তুমি কাঁদো কেন? সে বলে, আমার আদরের সোনামনি তায়িমকে কাজলা ফুটওভার ব্রিজে গুলি করে ফেলে রেখেছে। এ কথা শুনে আমিও কান্নাকাটি শুরু করলাম। পরবর্তীতে আমার সহকর্মী আমাকে সান্ত্বনা দেয়। পরে আমি শাহিদাকে বলি, তায়িমের কী অবস্থা? সে বলল, একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমি শাহিদাকে বললাম, তুমি তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাও। পরবর্তীতে আমার ছেলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবগত করি। কর্তৃপক্ষ আমাকে ১০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেন।

জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন আরও বলেন, আনুমানিক দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে শাহিদার সঙ্গে আমার দেখা হলে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আমার ছেলের কী খবর? সে বলল, সে কয়েকটি ওয়ার্ডে তায়িমকে খুঁজেছে, কিন্তু পায়নি। পরবর্তীতে আমরা দুজন একসঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও ইমার্জেন্সিতে খুঁজতে থাকি। কোথাও খুঁজে না পেয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাই। এমন সময় একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করে আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? আমি বললাম, ‘ভাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলিবিদ্ধ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে। আমি কোথাও খুঁজে পাইনি।’ ওই সাংবাদিক আমার কাছে আমার ছেলের ছবি দেখতে চান এবং আমি তাকে আমার ছেলের ছবি দেখাই।’ এরপর ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আমার মোবাইলে কিছু মৃত ব্যক্তির ছবি আছে, দেখেন সেখানে আপনার ছেলের ছবি আছে কি না?’ তখন তার মোবাইল থেকে মৃত ব্যক্তিদের ছবি দেখালে আমি আমার ছেলেকে মৃত অবস্থায় শনাক্ত করি। তখন সে বলল, ‘মর্গে কিছু বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে, সেখানে আপনি দেখতে পারেন।’

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী ময়নাল হোসেন বলেন, আমি মর্গের উদ্দেশে রওনা করলে সিকিউরিটি গার্ড (নিরাপত্তা রক্ষী) আমাকে বাধা দেয়। আমি আমার পরিচয় দিয়ে বলি, ‘আমি একজন পুলিশ সদস্য। যাত্রাবাড়ী এলাকায় আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে। তার লাশ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’ তখন সিকিউরিটি গার্ড আমাকে মর্গে যেতে দেয়। মর্গে গিয়ে দেখি প্রায় ২০ থেকে ৩০টি লাশ পড়ে আছে। আমি বারবার আমার ছেলের লাশ খুঁজতে থাকি, কিন্তু খুঁজে পাইনি। তারপর আরও বিভিন্ন মর্গে যাই, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি।

শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন আরও বলেন, পরবর্তীতে নতুন বিল্ডিংয়ের ইমার্জেন্সির মর্গে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে আমার ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। সেখানে আরও অনেক লাশ ছিল। আমার ছেলের লাশ পেয়ে আমি এবং আমার শ্যালিকা শাহিদা আক্তার দুজনে কান্নাকাটি করতে থাকি। সেখানে অনেক সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক আসে। আমার ছেলের লাশের ওপরে, বুকে, পেটে ও পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমি সেখানে থাকা সাংবাদিকদের বলি, ‘একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে?’ পরবর্তীতে মর্গ থেকে বের হয়ে আসি।

জবানবন্দিতে ময়নাল হোসেন বলেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে আমার দুজন সহকর্মী ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমার কাছে আসে এবং আমাকে সান্ত্বনা দেয়। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নেওয়ার জন্য শাহবাগ থানায় গিয়ে কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক রাত ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই।

ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার আমাকে বলে, আমরা শাহবাগ থানায় গিয়ে জানতে পেরেছি, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের দায়িত্ব শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতকে দিয়েছে। আমি এসআই শাহদাত কোথায় জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, এসআই শাহদাত থানায় আছে। আমার সহকর্মীরা আমাকে জানান, এসআই শাহদাত বলেছে, সেদিন সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের সময় শেষ হয়ে গেছে, পরের দিন সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) হবে। তখন আমরা মর্গের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে আমার সহকর্মীরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যাই। আমার শ্যালিকা নিজ বাড়িতে যায় এবং আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থান করি। আমার ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে তখন পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে অবগত করা হয়নি, কারণ সে অসুস্থ ছিল এবং এই সংবাদ শুনলে তার আরও অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা ছিল।

সাক্ষীর জবানবন্দিতে শহীদ তায়িমের বাবা আরও বলেন, পরের দিন ২১ জুলাই ২০২৪ আনুমানিক সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার সময় পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরাসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করি। মর্গে থেকে আমার ছেলের লাশ নিয়ে সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানা থেকে এসআই শাহদাত এলে আমার সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাকে আমার পরিচয় দেই এবং বলি, ‘আমার ছেলেকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে, দয়া করে দ্রুত সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেন।’ তিনি আমাকে দেখে কোন কথা না বলে অন্য একজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। পরবর্তীতে এসআই শাহদাত তার অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলেন এবং ব্যক্তিগত কাজ করতে থাকেন। এসআই শাহদাত অকারণে দেরি করতে থাকেন। আনুমানিক দুপুর ১২টার সময় এসআই শাহদাত সুরতহাল করার জন্য যান। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলির চিহ্নগুলো না লেখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনি পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লেখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন?’ এসআই শাহদাত আমাকে বলল, ‘এটা ওপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না।’ এসআই শাহদাত আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে।’ এই বলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। আমার ছেলে মারা গেছে এবং চাকরি হারানোর সম্ভাবনা আছে এবং ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে। এই চিন্তা করে আমি সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। সুরতহাল শেষে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে, পোস্টমর্টেম করাতে পারছি না। এসআই শাহদাত আমাদের কাছে দুই-তিনবার এলে তাকে অনুরোধ করি, আমার ছেলের ময়নাতদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দেন। কিন্তু এসআই শাহদাত কোনো সহযোগিতা করেননি। পরবর্তীতে আনুমানিক বিকেল ৪টার সময় তায়িমের লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। আনুমানিক বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে ছেলের পোস্টমর্টেম শেষে আমরা লাশ বুঝে পাই। পরবর্তীতে আমার ছেলের লাশ নিয়ে আমার সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যাই এবং গোসল করানোর জন্য প্রস্তুতি নিই। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সহকারী ইমাম পুলিশের উপপরিদর্শক (এএসআই) জাহাঙ্গীর ও তার দুজন সহকর্মী এবং আমার একজন আত্মীয় মুফতি হায়দার বিন সাদের গোসল করায়। আমার ছেলের লাশের কোমড়ের বাম পাশে বড় একটি গর্তের দাগ দেখা যায়। আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারি, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ তায়িমের বাবা ময়নাল হোসেন আরও বলেন, গোসল শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে প্রথম জানাজা শেষ করে আত্মীয়স্বজনসহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা করি। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় দ্বিতীয় জানাজা শেষ করে পারিবারিক গোরস্থানে ছেলের লাশের দাফন সম্পন্ন করি।

পুলিশ কর্মকর্তা ময়নাল বলেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই আমি ঢাকায় আসি। তায়িমের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যান্যদের কাছে শুনতে পাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আমার ছেলে তায়িম প্রতিদিন আন্দোলনে যোগ দিত। তার বন্ধুদের কাছে শুনেছি, ঘটনার দিন দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। ঘটনার সময় তায়িম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত যাত্রাবাড়ীর কাজলা ফুটওভার ব্রিজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল। পরবর্তীতে যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির হোসেন, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন পুলিশ আমার ছেলে তায়িম ও তার বন্ধুদেরকে চতুর্দিক দিয়ে ধাওয়া করলে কোন দিকে যেতে না পেরে আমার ছেলে ও তার বন্ধুরা লিটনের চায়ের দোকানে প্রবেশ করে এবং চায়ের দোকানের শাটার টেনে নিচে নামায়। পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে বের করে লাঠি, রাইফেলের বাট দিয়ে অনেক মারতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। আমার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে। আমার ছেলে ‘মা… মা…’ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তায়িমকে পেছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে ‘মা… মা…’ করে কাঁদতে থাকে। একটি গুলি রাহাতের পায়ে লাগে। রাহাত তার জীবন বাঁচাতে আমার ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার ছেলে সেখানে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে তায়িমের আরেক বন্ধু শাহরিয়ার ও চা দোকানদার লিটন আমার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইন্সপেক্টর জাকির, ইন্সপেক্টর মামুন, এসআই সাজ্জাদ বাধা দেয়। আমার ছেলে অনেকক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে। পরবর্তীতে আমার ছেলেকে একটি ভ্যানে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।-এনটিভি