চুয়াডাঙ্গা ০৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার

Padma Sangbad
৩০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে পুরোপুরি মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে ইরাকজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। এ উপলক্ষে দেশটির সরকার চার দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করেছে।

মঙ্গলবার ইরাক ত্যাগ করেছেন দেশটিতে অবস্থান করা শেষ মার্কিন সেনারা। এর মধ্য দিয়ে ইরাকের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। তবে মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে দেশটির বিভিন্ন মহলে।

ইরাকিদের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ায় প্রতিবেশী ইরানের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ পরিস্থিতিতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন আগেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আলজাজিরাকে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তার দাবি, নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরাকি বাহিনী এখন সক্ষম।

২০২৪ সালে প্রত্যাহারের সমঝোতা ইরাক থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়ে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়। সে সময় ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের বেশির ভাগকেই সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হয়েছিল। পরে ২০১১ সালে মার্কিন সেনাদের একটি বড় অংশ ইরাক ছাড়ে।

তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য আবারও ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত ছিল।

ইরাকে নতুন যুগের দাবি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এটিকে দেশের জন্য নতুন দিনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ইরাক বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়ার পথে এগিয়েছে এবং দেশের পুরো ভূখণ্ডে জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরও দৃঢ় হবে।

ইরানে সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরিও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটবে।

তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরাক পুরোপুরি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তার আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনীর দ্রুত প্রস্থান দেশটিতে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি করতে পারে।

ইরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা ইরাকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সসহ তেহরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চলতি মাসে ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

রয়টার্সকে ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাক ত্যাগ কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে যে সামরিক ভারসাম্য ছিল, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে তা পরিবর্তিত হতে পারে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান হলেও দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ইরানের প্রভাব এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

আপডেট : ০৯:৫৫:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

দুই দশক পর ইরাক থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার

আপডেট : ০৯:৫৫:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
৩০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে পুরোপুরি মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে ইরাকজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। এ উপলক্ষে দেশটির সরকার চার দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করেছে।

মঙ্গলবার ইরাক ত্যাগ করেছেন দেশটিতে অবস্থান করা শেষ মার্কিন সেনারা। এর মধ্য দিয়ে ইরাকের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। তবে মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর সম্ভাব্য নিরাপত্তা শূন্যতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে দেশটির বিভিন্ন মহলে।

ইরাকিদের মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ায় প্রতিবেশী ইরানের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ পরিস্থিতিতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন আগেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আলজাজিরাকে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই। তার দাবি, নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরাকি বাহিনী এখন সক্ষম।

২০২৪ সালে প্রত্যাহারের সমঝোতা ইরাক থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়ে ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়। সে সময় ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের বেশির ভাগকেই সরিয়ে নেওয়া হয়। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কিছু মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হয়েছিল। পরে ২০১১ সালে মার্কিন সেনাদের একটি বড় অংশ ইরাক ছাড়ে।

তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য আবারও ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত ছিল।

ইরাকে নতুন যুগের দাবি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এটিকে দেশের জন্য নতুন দিনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ইরাক বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়ার পথে এগিয়েছে এবং দেশের পুরো ভূখণ্ডে জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরও দৃঢ় হবে।

ইরানে সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরিও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটবে।

তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরাক পুরোপুরি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তার আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনীর দ্রুত প্রস্থান দেশটিতে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি করতে পারে।

ইরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা ইরাকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সসহ তেহরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চলতি মাসে ইরাক থেকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

রয়টার্সকে ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাক ত্যাগ কৌশলগতভাবে ইরানের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে যে সামরিক ভারসাম্য ছিল, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে তা পরিবর্তিত হতে পারে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান হলেও দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ইরানের প্রভাব এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।