দেশজুড়ে কারফিউ জারি, সেনা টহল জোরদার

অনলাইন ডেস্ক।।
আজ ২০ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে টানা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের গুলিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৭ জন নিহত হন। সরকার ১৮ জুলাই থেকে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর মাঝেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়, এ দিন পর্যন্ত ১৪৮ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
২০ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করে সরকার। পাশাপাশি পরের দুদিন অর্থাৎ ২১ ও ২২ জুলাই সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এ ছাড়া স্পেন ও ব্রাজিল সফর বাতিল করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের গ্রেপ্তার এবং গুমের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয় হাসিনা সরকার। আগের দিন গ্রেপ্তার বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে এ দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়; গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। এ ছাড়া ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের সন্ধান দাবি করার পর দুজনকে আদালতে তোলা হয়।
প্রথম দফায় ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে ২০ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ চলে। মাঝে দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা ২টা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়। ২১ জুলাই বেলা ৩টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়। পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ ২১ জুলাই থেকে সারাদেশে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।
২০ জুলাই তৃতীয় দিনের মতো সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ সেবা বন্ধ রাখে সরকার। কারফিউ চলার সময় সারাদেশে যানবাহন চলাচলও বন্ধ থাকে। ১৯ জুলাই রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার দমন-পীড়ন চালিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না।’
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াত। তাদের সমর্থক সন্ত্রাসীরা জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা চালাচ্ছে।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটা আন্দোলনে ভর করে বিএনপি-জামায়াত দেশের মানুষকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। তারেক জিয়ার নির্দেশে শিবির ও ছাত্রদলের ক্যাডার বাহিনীসহ সারাদেশের সন্ত্রাসীদের ঢাকা শহরে জড়ো করা হয়েছে। এই দুষ্কৃতকারীরা সব সন্ত্রাসী ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছে।’
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ১৯ জুলাই মধ্যরাতে সরকারের আইন, শিক্ষা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর কাছে ৮ দফা তুলে ধরেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। পরে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘আমরা দেখেছি ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে। ছাত্ররা একটি যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছে। আমাদের ব্যানার ব্যবহার করে কেউ যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অপচেষ্টা করে এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালাও-গোড়াও, ভাঙচুর, সহিংসতা করে সেটাকে আমরা কখনই সমর্থন করি না। সেই দায় তাদেরই নিতে হবে।’
আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী গাড়ি পোড়ানো, মেট্রোরেলে আগুন দেওয়ার মতো কাজে জড়িত থাকতে পারেন না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত নন। যারা সরকারি স্থাপনায় আগুন দিয়েছে, তাদের দায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেবে না। এ ছাড়া দেশজুড়ে সংগঠিত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দায়ভার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেবে না।
২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, মেরুল বাড্ডা ও মিরপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
মিরপুরে সংঘর্ষ চলাকালে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পিকেটার ও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। এ সময় মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। জননিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার (তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার) বন্ধ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারফিউ জারির কারণে রাজধানীর প্রধান বিপণিবিতান ও প্রধান সড়কের পাশের দোকানপাট বন্ধ ছিল। সড়কে মানুষের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম।
জননিরাপত্তায় জারি করা কারফিউ কেউ অমান্য করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হবে বলে ডিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এদিন গভীর রাতে মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়কের সঙ্গে বৈঠক করেন সরকারের মন্ত্রীরা। এ সময় তারা সরকারের কাছে ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এসব দাবি মানলেই কেবল কোটা সংস্কারের এক দফা দাবির বিষয়ে আলোচনা করতে তারা সম্মত হবেন বলে জানান। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেসব দাবি করেছেন, তা যৌক্তিক এবং সমাধানযোগ্য।’
২০ জুলাই রাজধানীতে সহিংসতা ঠেকাতে র?্যাবের হেলিকপ্টার টহল অব্যাহত ছিল। রাজধানীর বঙ্গভবন, গণভবন, বেতার ভবন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা অধিদপ্তর, থানা ভবন, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবন, সারাদেশের কারাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। এ অবস্থায় জরুরি কাজে বাইরে বের হওয়ার জন্য নিতে হয় ডিএমপির কারফিউ পাস।
সকাল থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ ও কাজলা এলাকায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে রায়েরবাগে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণ করে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন; আহত হন শতাধিক।
এদিন সকাল থেকে রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডা এলাকায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। সেখানেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে ভাটারা এলাকায় ইউআইইউ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইউবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকালে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও আজিমপুর এলাকায়ও বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।
মোহাম্মদপুরের বছিলায় বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। তারা উত্তরার আজমপুর রেলগেট অবরোধ করেন। দুপুর ১২টার দিকে আজমপুরে সেক্টর-৬-এর হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে। সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়।
এ দিন সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ভবনে আগুন দিলে পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আটকা পড়লে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র?্যাব ও পুলিশ হেলিকপ্টারের সহায়তায় উদ্ধার করে। ভবনে থাকা হাসপাতাল, ব্যাংক, চায়নিজ রেস্টুরেন্টসহ অর্ধশতাধিক দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ভাঙচুর, রেডিও কলোনিতে দফায় দফায় সংঘর্ষে ২৫ জন আহত হয়। পরে সেনা সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
























