চুয়াডাঙ্গা ০১:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারি

Padma Sangbad

অনলাইন ডেস্ক।।
রাষ্ট্রপতি পদে তৃণমূল থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দিয়েছে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তার মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। এখন সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই পদে যাওয়া ১৯তম ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলে এবং দলের বাইরে প্রশংসায় ভাসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রনেতা ছিলেন। কর্মজীবনে শিক্ষকতাও করেছেন। এই পেশায় কম সময় কাটিয়ে রাজনীতির জীবনে পা রাখেন। কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে পৌর সভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য-মন্ত্রী এবং অতঃপর দেশের রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। নাট্য নির্দেশক, সু-অভিনেতাও ছিলেন মির্জা ফখরুল। গুণী নাট্যজন ফনীদী ভূষণ পালিদের হাতে মঞ্চনাটকের হাতেঘড়ি তার। ছাত্রজীবনে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রাচীন নাট্যসমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকা মির্জা ফখরুলের ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও ব্যাপক সুনাম ছিল।

‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিএনপির এই মনোনয়ন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তার বর্ণাঢ্য জীবন ইতিহাস। স্কুল থেকেই কৃতী ছাত্র ছিলেন মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁও প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি।

ছাত্র আন্দোলন

১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে

উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, মির্জা ফখরুল সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক পদে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতাও করেন। তিনি একজন সফল শিক্ষক হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যে সুনাম অর্জন করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন, ১৯৮২ সালে এস.এ. বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

রাজনীতিতে প্রবেশ

মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দলের সঙ্গেই যুক্ত আছেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি; এরপর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতার এক পদ’ অনুসরণ করে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সেই থেকে বিএনপি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ এবং ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটি মির্জা ফখরুলের আসন। বিএনপি প্রবীণ নেতারা মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলে রেখেছেন, দলের পতাকাকে উড্ডীন রেখেছেন তাকে সম্মান দেওয়া উচিত। এই আসন ভিন্ন কোনো চিন্তার অবকাশ নেই বলে মনে করেন সিনিয়র নেতারা।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ

রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।

ব্যক্তিগত জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ নিয়ে সংসার। স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, এখন অবসরে। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত পৌরসভার চেয়ারম্যান।

বিএনপি ও সরকারের তিন পদে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা

ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারেক রহমান সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তফসিল অনুযায়ী গতকাল শেষ দিনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী ঘোষণা ও নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপি। এখন যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। রাষ্ট্রপতি পদে ২০ আগস্ট, সংসদের সভাকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল অলি আহমদ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দল ও সরকারের তিনটি পদ ফাঁকা হয়ে যাবে।

বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের আগে গতকাল দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ছেড়েছেন মির্জা ফখরুল। সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদও ছাড়বেন শিগগিরই। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এখন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি কেÑ এই নিয়ে দলের ভেতরে কয়েক দিন ধরে দুজন নেতার নাম বেশি আলোচনায় এসেছে। তাদের একজন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সালাহউদ্দিন আহমদকে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি ও নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসন এমপির নাম আলোচনা হচ্ছে।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে।

আপডেট : ১২:২৪:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারি

আপডেট : ১২:২৪:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক।।
রাষ্ট্রপতি পদে তৃণমূল থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দিয়েছে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তার মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। এখন সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই পদে যাওয়া ১৯তম ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলে এবং দলের বাইরে প্রশংসায় ভাসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রনেতা ছিলেন। কর্মজীবনে শিক্ষকতাও করেছেন। এই পেশায় কম সময় কাটিয়ে রাজনীতির জীবনে পা রাখেন। কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে পৌর সভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য-মন্ত্রী এবং অতঃপর দেশের রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। নাট্য নির্দেশক, সু-অভিনেতাও ছিলেন মির্জা ফখরুল। গুণী নাট্যজন ফনীদী ভূষণ পালিদের হাতে মঞ্চনাটকের হাতেঘড়ি তার। ছাত্রজীবনে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রাচীন নাট্যসমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকা মির্জা ফখরুলের ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও ব্যাপক সুনাম ছিল।

‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিএনপির এই মনোনয়ন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তার বর্ণাঢ্য জীবন ইতিহাস। স্কুল থেকেই কৃতী ছাত্র ছিলেন মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁও প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি।

ছাত্র আন্দোলন

১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে

উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, মির্জা ফখরুল সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক পদে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতাও করেন। তিনি একজন সফল শিক্ষক হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যে সুনাম অর্জন করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস.এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন, ১৯৮২ সালে এস.এ. বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

রাজনীতিতে প্রবেশ

মির্জা ফখরুল ইসলাম ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দলের সঙ্গেই যুক্ত আছেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি; এরপর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতার এক পদ’ অনুসরণ করে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সেই থেকে বিএনপি মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ এবং ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটি মির্জা ফখরুলের আসন। বিএনপি প্রবীণ নেতারা মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলে রেখেছেন, দলের পতাকাকে উড্ডীন রেখেছেন তাকে সম্মান দেওয়া উচিত। এই আসন ভিন্ন কোনো চিন্তার অবকাশ নেই বলে মনে করেন সিনিয়র নেতারা।

রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ

রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।

ব্যক্তিগত জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ নিয়ে সংসার। স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, এখন অবসরে। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত পৌরসভার চেয়ারম্যান।

বিএনপি ও সরকারের তিন পদে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি কারা

ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারেক রহমান সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তফসিল অনুযায়ী গতকাল শেষ দিনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী ঘোষণা ও নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপি। এখন যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। রাষ্ট্রপতি পদে ২০ আগস্ট, সংসদের সভাকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল অলি আহমদ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দল ও সরকারের তিনটি পদ ফাঁকা হয়ে যাবে।

বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের আগে গতকাল দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ছেড়েছেন মির্জা ফখরুল। সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদও ছাড়বেন শিগগিরই। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এখন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি কেÑ এই নিয়ে দলের ভেতরে কয়েক দিন ধরে দুজন নেতার নাম বেশি আলোচনায় এসেছে। তাদের একজন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সালাহউদ্দিন আহমদকে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি ও নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসন এমপির নাম আলোচনা হচ্ছে।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে।