মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে উত্তেজনা: সৌদির পাশে পাকিস্তান-তুরস্ক, কঠোর হুঁশিয়ারি হুথিদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দৈনিক পদ্মা সংবাদ।
সৌদি আরবকে ঘিরে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা এবং দেশটির পাশে পাকিস্তান ও তুরস্কের অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Mecca Joint Defence Agreement) এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কের পক্ষ থেকে রিয়াদের প্রতি সমর্থনের বার্তা আসায় চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও জ্বালানি অবকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির মধ্যে রিয়াদ মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
পাকিস্তানের কঠোর অবস্থান
সৌদি আরবের প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক ও প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পর্যায়েও পাশে থাকবে। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বের প্রয়োজন অনুযায়ী পাকিস্তান ‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত’ যেতে প্রস্তুত।
তবে সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কাছে সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি। ফলে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা এখনো পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
তুরস্কও জানাল রিয়াদের পাশে থাকার কথা
এদিকে তুরস্কও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর হামলা হচ্ছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে সংহতির বিষয়টি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ফিদান আরও জানান, সৌদি আরবের কিছু সামরিক ও বিশেষ করে প্রযুক্তিগত প্রয়োজন দেখা দিলে তুরস্ক সেগুলো পূরণে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে একইসঙ্গে আঙ্কারা কূটনৈতিকভাবে সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টার কথাও জানিয়েছে।
হুথিদের পাল্টা হুঁশিয়ারি
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্ককে সরাসরি সতর্ক করেছে হুথিরা। আনসারাল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হলে হুথিরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সতর্কবার্তা মূলত পাকিস্তান ও তুরস্কের সরকারের উদ্দেশে। তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডে ওই দুই দেশ সরাসরি যুক্ত হলে তাদেরও সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
একইসঙ্গে তিনি পাকিস্তান ও তুরস্কের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইয়েমেনের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। অর্থাৎ হুথিদের বক্তব্যে দুই দেশের জনগণ ও সরকারের অবস্থানকে আলাদাভাবে দেখানোর চেষ্টা রয়েছে।
মক্কা চুক্তির সামনে বড় পরীক্ষা
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ৭ আগস্ট মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। পাকিস্তান পরে চুক্তিটিকে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ বলে বর্ণনা করে এবং জানায়, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা চুক্তিটির জন্য প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তবে সৌদি আরবের ওপর হামলা হলেই পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাবে—এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ এবং সংঘাতের পরবর্তী গতিপথই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের সংঘাত, ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। পাকিস্তান ও তুরস্ক যদি সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হয়, তাহলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তবে বর্তমান পর্যায়ে দুই দেশ কী মাত্রায় সামরিক সহযোগিতায় যাবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।



















