সেই রাতের ঘটনায় মুখোমুখি দীপ ও দিশা

অনলাইন ডেস্ক।।
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর জট খোলেনি এক সপ্তাহেও। উত্তরার বাসা থেকে বন্ধুর ডাকে বেরিয়ে পরদিন টঙ্গীর তুরাগ নদে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ, উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে দীর্ঘ সময় অবস্থান, সেখানে অবস্থানকালীন ১৫-২০ মিনিট সময়ের জন্য আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের অন্যত্র সরে গিয়ে রহস্যজনক যোগাযোগ,
এরপর গভীর রাতে টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকায় যাতায়াত, সেখানে মাদক কেনা ও সেবনের দাবি, পুলিশের উপস্থিতিতে ছোটাছুটি এবং পরে তাহসিফের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া- সব মিলিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। এ ঘটনায় বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার দীপকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণী জেরিকা তাসনিম দিশাকেও দীপের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন দীপকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে ছিলেন দীপ। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। তার দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার ঘটনাটি একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। তাহসিফ সাউরি ঘটনার আগে সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও জেরিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে ঘোরাফেরাসহ বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছেন। এ যাবৎ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে প্রকাশ পায়, সাউরিকে মৃত্যুর আগে শেষ বারের মতো তাদের সঙ্গে দেখা গেছে। এই অবস্থায় আসামিরা কোনো না কোনোভাবে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মর্মে পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনসহ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার করাসহ ৮ কারণে আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও ৭ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
রিমান্ড চেয়ে আবেদনে যে আটটি কারণ উল্লেখ করে পুলিশ, সেগুলো হলো- সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনা করে আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই, বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন; ভিকটিমের সঙ্গে আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালীন কিছু সময়ের জন্য অন্যত্র সরে গিয়ে ১৫-২০ মিনিট কোথায় যোগাযোগ করেছেন, তার জন্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন; ভিকটিম ও দীপসহ অন্যদের ব্যবহৃত মোবাইলের সিডিআর সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা; মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন; অজ্ঞাতনামা অপর আসামিদের গ্রেপ্তার ও শনাক্তের লক্ষ্য; আলামত উদ্ধার করার লক্ষ্য; মোটিভ অব মার্ডার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ; হত্যাকা-ের স্থান নির্ধারণ করার লক্ষ্য।
রিমান্ডে দীপের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদš-সংশ্লিষ্টরা বলেন, টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকার ওই মাঠে অবস্থানকালে পুলিশের একটি টহল দল সেখানে উপস্থিত হলে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে একটি পিলারের আড়ালে আত্মগোপন করেন। পরে পুলিশের কাছে নিজেকে তাহসিফের বন্ধু ও সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন। পুলিশ তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বললে তিনি বস্তির ভেতরের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু তাহসিফ কোথায় গেলেন? কীভাবে নদীর কাছে পৌঁছালেন কিংবা তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আর কারও দেখা হয়েছিল কিনা? সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি দীপ। তার দাবি, পরে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেও পাননি। তাহসিফের ফোন বন্ধ পাওয়ার কারণ হিসেবে দীপ জানিয়েছেন, এর আগে তার কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন তাহসিফ। ফলে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বলে তার ধারণা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের কাছে দীপের বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রথমদিকে তিনি দাবি করেছিলেন, রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার শেষে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। পরে জিজ্ঞাসাবাদে টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকায় যাওয়ার কথা জানান। কোনো কোনো পর্যায়ে ওই এলাকায় না যাওয়ার কথাও বলেছেন। এ ছাড়া তাহসিফের মোটরসাইকেলের অবস্থান, শেষ রাতে তাদের চলাচলের পথ এবং পুলিশের উপস্থিতিতে দীপের নিজের পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে বারে যাওয়া বান্ধবী দিশাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। ইতোমধ্যে দীপ ও দিশাকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ, বারে তাদের কথাবার্তা এবং পরবর্তী সময়ে তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে দিশার যোগাযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে তারা। ঘটনার রাতের সময়রেখা পুনর্গঠন করতে দিশার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা এখনও চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলেও দীপ ও দিশার পৃথক বক্তব্যে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। সেগুলো আরও বিশদভাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতীয়মান। তবে এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে- তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান।


















