চুয়াডাঙ্গা ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে মিশে আছে বাংলা সন

Padma Sangbad
১০৩

কৃষি প্রতিবেদক।। এদেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে বাংলা সন। শহুরে জীবনে নববর্ষ উদযাপন নিয়ে নানা রকম বিতর্ক থাকলেও, প্রায় প্রতি ঋতুকেই আলাদাভাবে উৎযাপন করে গ্রামীণ জনপদের খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষি কাজের সুবিধায় যে বর্ষপঞ্জিকা উদ্ভাবন হয়েছিল; বৈজ্ঞানিকভাবেই এর গুরুত্ব আছে বাংলার কৃষি সংস্কৃতিতে, যার ইতিহাস বহু বছরের পুরনো।

মাথার ওপর তপ্ত রোদে যখন ঝলসে যায় ফসলের মাঠ; পাকা ধানের আনন্দে ভরে ওঠে কৃষকের মন। আম-কাঁঠালের বোনে মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে বাড়ির চার পাশ। দুরন্ত শৈশবে প্রকৃতির প্রখর খরতাপে হাওর বিলে জলকেলিতে মেতে ওঠে শিশুরা; তখন প্রকৃতি নিজ থেকেই জানান দেয় ঋতু চক্রে এসেছে বৈশাখ। এসেছে নতুন বাংলা বছর। বৈশাখ আসে বাঙালির জীবনে নতুন উৎসব নিয়ে। বাঙালির ঘরে, জনজীবনে আর আর্থসামাজিক সংস্কৃতিতে এরকম উৎসব দ্বিতীয়টি নেই। সব স্তরের মানুষের সঙ্গে এই উৎসবের রয়েছে গভীর এক যোগসূত্র। নতুন আশায় বুক বাধে কৃষক। শহুরে সংস্কৃতিতে বাংলা বছরের প্রথম দিনটি ঘটা করে উৎযাপন করলেও কৃষি প্রধান এ দেশের কৃষকরা উৎযাপন করে বর্ষপঞ্জিকার প্রতিটি দিন। বৈশাখের তপ্ত রোদে যখন শুকিয়ে যায় হাওর বাওর তখন ছোট মাছ ধরেই দিন কাটে জেলেদের। বর্ষায় যখন বৃষ্টির পানিতে নদীতে ফেরে যৌবন; তখন বড় মাছের আশয় বুক বাধে জেলেরা। এভাবে ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন। তাদের সংগ্রাম-বেঁচে থাকা। ইতিহাস বলছে, কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে, অর্থাৎ ১৫৫৬ সালের পাঁচ নভেম্বর থেকে। প্রধানত কৃষকদের খাজনাপাতি দেয়ার সুবিধার্থে এই সনের প্রবর্তন করা হয়। এ কারণে এই সনের আরেক নাম ‘ফসলি সন’। প্রথমে এটিই প্রচলিত ছিল, পরে এর পরিচিতি দাঁড়ায় বঙ্গাব্দ নামে, যা আজও কার্যকর রয়েছে। গ্রামীণ সংস্কৃতি কৃষক বা জেলের মতো তাদের পরিবার বাংলা বর্ষ, খনা আর ডাকের বচনকে আঁকড়ে ধরে আছে আজও। ঋতু বৈচিত্রের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে দেশের কৃষি বৈচিত্র। তাইতো সব মন্ত্রণালয়ে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও কৃষি মন্ত্রণালয় চলে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে। বাংলা সন প্রবর্তন হয় কৃষকের ফসল রোপণ, ফসলের সময়ভিত্তিক পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ অন্য কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে। নববর্ষ ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। কৃষকের পারিবারিক ও সামাজিক সব কর্মকান্ড বাংলা সন হিসেবে চলত। কৃষির সঙ্গে জড়িত সবস্তরের জনগণ ছিল বাংলা সনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা সনের প্রথম দিনই নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ। কৃষিতে শুরু হওয়া কৃষকের প্রথম দিন। এ দিনকে ঘিরে গ্রামের মানুষদের আলাদা পরিকল্পনা, নতুন বছরের জন্য নতুন করে ঘরোয়া জিনিসপত্র কেনার জন্য মেলার আয়োজন। ব্যবসায়ীদের পাওনা আদায়ের জন্য হালখাতা। পুরনো বছরের বকেয়ার খাতার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন বছরের খাতা খোলার দিন। নববর্ষ উৎযাপন নিয়ে যখন ধর্মে বর্ণে বিতর্ক তোলার চেষ্টা; তখন ঋতুবৈচিত্রের এই উৎসবকে অস্বীকার করাদের অবাঙালি বলে মনে করেন ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন। তিনি মনে করেন, প্রকৃতিগত ভাবেই যতদিন দেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি কৃষির হাতে; ততদিন এদেশে উদযাপিত হবে বাংলা বর্ষপঞ্জিকার প্রতিটি দিন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নববর্ষ এবং কৃষি উভয়ের মধ্যেই এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামীণ জীবন থেকে শহুরে জীবন নববর্ষের ছোঁয়ায় রঙিন হয়েছে। বর্তমানে বাংলা নববর্ষ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন সার্বজনীন বাংলা নববর্ষ উৎসবের প্রধান দুই আয়োজনে পরিণত হয়েছে। তবু নববর্ষ আসলে কৃষকের জন্য। নতুন বছরে কৃষকের মুখের হাসি ফুটুক। যে হাসিতে থাকবে না কোনো কৃত্রিমতা। সবুজ ফসলের খেত দেখে যে আশায় তারা বুক বাঁধে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় যেন সে হাসিতে ভাটা না পড়ে। সোনার ফসল ঘরে তুলে, ফসলের ন্যায্য মূল্য পেয়ে, সে হাসি অটুট থাকুক। শুভ হোক সবার নতুন বছর।।

আপডেট : ১২:৫৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে মিশে আছে বাংলা সন

আপডেট : ১২:৫৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
১০৩

কৃষি প্রতিবেদক।। এদেশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে বাংলা সন। শহুরে জীবনে নববর্ষ উদযাপন নিয়ে নানা রকম বিতর্ক থাকলেও, প্রায় প্রতি ঋতুকেই আলাদাভাবে উৎযাপন করে গ্রামীণ জনপদের খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষি কাজের সুবিধায় যে বর্ষপঞ্জিকা উদ্ভাবন হয়েছিল; বৈজ্ঞানিকভাবেই এর গুরুত্ব আছে বাংলার কৃষি সংস্কৃতিতে, যার ইতিহাস বহু বছরের পুরনো।

মাথার ওপর তপ্ত রোদে যখন ঝলসে যায় ফসলের মাঠ; পাকা ধানের আনন্দে ভরে ওঠে কৃষকের মন। আম-কাঁঠালের বোনে মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে বাড়ির চার পাশ। দুরন্ত শৈশবে প্রকৃতির প্রখর খরতাপে হাওর বিলে জলকেলিতে মেতে ওঠে শিশুরা; তখন প্রকৃতি নিজ থেকেই জানান দেয় ঋতু চক্রে এসেছে বৈশাখ। এসেছে নতুন বাংলা বছর। বৈশাখ আসে বাঙালির জীবনে নতুন উৎসব নিয়ে। বাঙালির ঘরে, জনজীবনে আর আর্থসামাজিক সংস্কৃতিতে এরকম উৎসব দ্বিতীয়টি নেই। সব স্তরের মানুষের সঙ্গে এই উৎসবের রয়েছে গভীর এক যোগসূত্র। নতুন আশায় বুক বাধে কৃষক। শহুরে সংস্কৃতিতে বাংলা বছরের প্রথম দিনটি ঘটা করে উৎযাপন করলেও কৃষি প্রধান এ দেশের কৃষকরা উৎযাপন করে বর্ষপঞ্জিকার প্রতিটি দিন। বৈশাখের তপ্ত রোদে যখন শুকিয়ে যায় হাওর বাওর তখন ছোট মাছ ধরেই দিন কাটে জেলেদের। বর্ষায় যখন বৃষ্টির পানিতে নদীতে ফেরে যৌবন; তখন বড় মাছের আশয় বুক বাধে জেলেরা। এভাবে ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন। তাদের সংগ্রাম-বেঁচে থাকা। ইতিহাস বলছে, কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে, অর্থাৎ ১৫৫৬ সালের পাঁচ নভেম্বর থেকে। প্রধানত কৃষকদের খাজনাপাতি দেয়ার সুবিধার্থে এই সনের প্রবর্তন করা হয়। এ কারণে এই সনের আরেক নাম ‘ফসলি সন’। প্রথমে এটিই প্রচলিত ছিল, পরে এর পরিচিতি দাঁড়ায় বঙ্গাব্দ নামে, যা আজও কার্যকর রয়েছে। গ্রামীণ সংস্কৃতি কৃষক বা জেলের মতো তাদের পরিবার বাংলা বর্ষ, খনা আর ডাকের বচনকে আঁকড়ে ধরে আছে আজও। ঋতু বৈচিত্রের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে দেশের কৃষি বৈচিত্র। তাইতো সব মন্ত্রণালয়ে ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও কৃষি মন্ত্রণালয় চলে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে। বাংলা সন প্রবর্তন হয় কৃষকের ফসল রোপণ, ফসলের সময়ভিত্তিক পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ অন্য কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে। নববর্ষ ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। কৃষকের পারিবারিক ও সামাজিক সব কর্মকান্ড বাংলা সন হিসেবে চলত। কৃষির সঙ্গে জড়িত সবস্তরের জনগণ ছিল বাংলা সনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা সনের প্রথম দিনই নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ। কৃষিতে শুরু হওয়া কৃষকের প্রথম দিন। এ দিনকে ঘিরে গ্রামের মানুষদের আলাদা পরিকল্পনা, নতুন বছরের জন্য নতুন করে ঘরোয়া জিনিসপত্র কেনার জন্য মেলার আয়োজন। ব্যবসায়ীদের পাওনা আদায়ের জন্য হালখাতা। পুরনো বছরের বকেয়ার খাতার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন বছরের খাতা খোলার দিন। নববর্ষ উৎযাপন নিয়ে যখন ধর্মে বর্ণে বিতর্ক তোলার চেষ্টা; তখন ঋতুবৈচিত্রের এই উৎসবকে অস্বীকার করাদের অবাঙালি বলে মনে করেন ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন। তিনি মনে করেন, প্রকৃতিগত ভাবেই যতদিন দেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি কৃষির হাতে; ততদিন এদেশে উদযাপিত হবে বাংলা বর্ষপঞ্জিকার প্রতিটি দিন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নববর্ষ এবং কৃষি উভয়ের মধ্যেই এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামীণ জীবন থেকে শহুরে জীবন নববর্ষের ছোঁয়ায় রঙিন হয়েছে। বর্তমানে বাংলা নববর্ষ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন সার্বজনীন বাংলা নববর্ষ উৎসবের প্রধান দুই আয়োজনে পরিণত হয়েছে। তবু নববর্ষ আসলে কৃষকের জন্য। নতুন বছরে কৃষকের মুখের হাসি ফুটুক। যে হাসিতে থাকবে না কোনো কৃত্রিমতা। সবুজ ফসলের খেত দেখে যে আশায় তারা বুক বাঁধে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল আবহাওয়ায় যেন সে হাসিতে ভাটা না পড়ে। সোনার ফসল ঘরে তুলে, ফসলের ন্যায্য মূল্য পেয়ে, সে হাসি অটুট থাকুক। শুভ হোক সবার নতুন বছর।।