চুয়াডাঙ্গা ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজীর আহমেদ

Padma Sangbad
৭১

অনলাইন ডেস্ক।।
আওয়ামী লীগ আমলের বহুল আলোচিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশধারী পলাতক আসামি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বাংলাদেশ পুলিশকে এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় সরকার। বেনজীর আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ; কিন্তু অনুসন্ধান চলার মধ্যেই ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ।

গত ১২ জুন পুলিশ সদর দপ্তর দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আবুধাবি সরকারের মারফত জানতে পারে; কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। গতকাল রবিবার বিকালে জাতীয় সংসদে এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ করেন। তিনি সংসদকে বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্তসংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির সময় সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বেনজীর আহমেদের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর তাকে নিয়ে চারদিকে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল বেনজীরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। একই দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারা ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে। পরে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ আসে।

এরই মধ্যে খবর আসে, বেনজীর তার স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে আগেই দেশত্যাগ করেছেন। পরে বেনজীর নিজেও বোট ক্লাবের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের জন্য দেওয়া চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে থাকার কথা বলেন। ওই বছরই দুদক অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) খুঁজে পায়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এসব সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধের আদেশ দেন।

বেনজীর ও তার পরিবারের বিভিন্ন জায়গায় আরও জমি আছে বলে তখনই বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া দুবাইয়ে তার বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে জানতে পারে দুদক। ২০২৪ সালের ৬ জুন বেনজীর আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। ওই বছরের ৯ জুন তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ও তিন মেয়েকেও ডাকা হয়। কিন্তু তাদের কেউই দুদক কার্যালয়ে হাজির হননি। দেশ ছাড়ার আগেই ব্যাংকে থাকা বেশিরভাগ টাকা বেনজীর আহমেদ তুলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার কথা নিশ্চিত করে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুদকে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়ার পর বিচার চলছে। এটি হচ্ছে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। বাকি পাঁচ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত শেষে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বেনজীরের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে দুটি মামলার বিষয়ে আদালতের আদেশে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের জন্য দুদক থেকে আবেদন করা হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে।

এক প্রশ্নের জবাবে দুদকের এই কর্মকর্তা জানান, বেনজীরের বিষয়ে দুটি মামলার তথ্য তুলে ধরে ইন্টারপোলে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। একটি হচ্ছে, তার পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা; অপরটি হচ্ছে, তার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। পাসপোর্ট জালিয়াতি হচ্ছে, তিনি সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে জালিয়াতি করে সাধারণ ব্যক্তির (বেসরকারি) পাসপোর্ট গ্রহণ করে তা ব্যবহার করেছেন। তিনি একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। আরেকটি মামলা হচ্ছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা জ্ঞাতআয়বহির্ভূতভাবে অর্জন করেছেন। তবে তার পরিবারের অন্য সদস্যসহ মোট পাঁচটি মামলায় তার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ৭৬ কোটি টাকার বেশি।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য চিঠি পাঠনো হয়েছিল, এখন সরকারই তাকে দেশে ফেরানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও অনেকের মতো বেনজীরের বিরুদ্ধে তদন্ত গতি পায়। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুনে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়। এতসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে ধরতে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়।

এরপর মে মাসে এগারো কোটির বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। সেই মামলা বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ তার পুলিশ পরিচয় গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত ব্যক্তিগত (সাধারণ) পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমণ করতেন। সরকারি কর্মকর্তা ও আইজিপি হওয়া সত্ত্বেও তিনি অফিশিয়াল বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট) ব্যবহার না করে নিজেকে ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ পরিচয় দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন।

সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নিজ বিভাগ থেকে অনাপত্তি (এনওসি) নিতে হয়। সেই বাধ্যবাধকতা এড়াতেই বেনজীর আহমেদ নিজের পেশা গোপন করে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন। এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার মোট সাতটি পাসপোর্টের সন্ধান পায় এবং এ নিয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করে। বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পর্তুগালের পাসপোর্টধারী।

এদিকে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হলেও তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে কোথায় তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনো কোনো সূত্র দাবি করেছেম তারাও দুবাইয়ে আছেন। বেনজীর আহমেদ দুর্নীতির মাধ্যমে যে সম্পদ অর্জন করেছেন, তার একটি অংশ দুবাইয়ে পাচার করেছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বেনজীর আহমেদের নামে দুটি সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। এই দুটি সম্পদ কেনা হয়েছে ২০২৩ সালের ১২ জুন। প্রতিটি সম্পদের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।

এর আগে গত বছরের ১২ মে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে থাকা দুটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। এ ছাড়া তার নামে থাকা দুটি ব্যাংক হিসাবও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের স্ত্রীর নামে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। অ্যাপার্টমেন্টটি কেনা হয়েছিল ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি। অন্য অ্যাপার্টমেন্টটি দুবাই অল ওয়াসল আবাসিক এলাকায়। এই অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৭ মে।

আপডেট : ০৯:৪১:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বেনজীর আহমেদ

আপডেট : ০৯:৪১:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
৭১

অনলাইন ডেস্ক।।
আওয়ামী লীগ আমলের বহুল আলোচিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশধারী পলাতক আসামি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বাংলাদেশ পুলিশকে এক ইমেইল বার্তায় জানিয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় সরকার। বেনজীর আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ; কিন্তু অনুসন্ধান চলার মধ্যেই ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ।

গত ১২ জুন পুলিশ সদর দপ্তর দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আবুধাবি সরকারের মারফত জানতে পারে; কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। গতকাল রবিবার বিকালে জাতীয় সংসদে এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রকাশ করেন। তিনি সংসদকে বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্তসংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির সময় সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র‌্যাবের মহাপরিচালক। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বেনজীর আহমেদের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর তাকে নিয়ে চারদিকে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল বেনজীরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। একই দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারা ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে। পরে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ আসে।

এরই মধ্যে খবর আসে, বেনজীর তার স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে আগেই দেশত্যাগ করেছেন। পরে বেনজীর নিজেও বোট ক্লাবের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের জন্য দেওয়া চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে থাকার কথা বলেন। ওই বছরই দুদক অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) খুঁজে পায়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এসব সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধের আদেশ দেন।

বেনজীর ও তার পরিবারের বিভিন্ন জায়গায় আরও জমি আছে বলে তখনই বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া দুবাইয়ে তার বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে জানতে পারে দুদক। ২০২৪ সালের ৬ জুন বেনজীর আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। ওই বছরের ৯ জুন তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ও তিন মেয়েকেও ডাকা হয়। কিন্তু তাদের কেউই দুদক কার্যালয়ে হাজির হননি। দেশ ছাড়ার আগেই ব্যাংকে থাকা বেশিরভাগ টাকা বেনজীর আহমেদ তুলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার কথা নিশ্চিত করে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুদকে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়ার পর বিচার চলছে। এটি হচ্ছে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। বাকি পাঁচ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত শেষে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বেনজীরের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে দুটি মামলার বিষয়ে আদালতের আদেশে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে বেনজীরকে গ্রেপ্তারের জন্য দুদক থেকে আবেদন করা হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে।

এক প্রশ্নের জবাবে দুদকের এই কর্মকর্তা জানান, বেনজীরের বিষয়ে দুটি মামলার তথ্য তুলে ধরে ইন্টারপোলে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। একটি হচ্ছে, তার পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা; অপরটি হচ্ছে, তার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। পাসপোর্ট জালিয়াতি হচ্ছে, তিনি সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে জালিয়াতি করে সাধারণ ব্যক্তির (বেসরকারি) পাসপোর্ট গ্রহণ করে তা ব্যবহার করেছেন। তিনি একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। আরেকটি মামলা হচ্ছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা জ্ঞাতআয়বহির্ভূতভাবে অর্জন করেছেন। তবে তার পরিবারের অন্য সদস্যসহ মোট পাঁচটি মামলায় তার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ৭৬ কোটি টাকার বেশি।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য চিঠি পাঠনো হয়েছিল, এখন সরকারই তাকে দেশে ফেরানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও অনেকের মতো বেনজীরের বিরুদ্ধে তদন্ত গতি পায়। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুনে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়। এতসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে ধরতে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারি করা হয়।

এরপর মে মাসে এগারো কোটির বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। সেই মামলা বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ তার পুলিশ পরিচয় গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত ব্যক্তিগত (সাধারণ) পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমণ করতেন। সরকারি কর্মকর্তা ও আইজিপি হওয়া সত্ত্বেও তিনি অফিশিয়াল বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট) ব্যবহার না করে নিজেকে ‘বেসরকারি চাকরিজীবী’ পরিচয় দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন।

সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নিজ বিভাগ থেকে অনাপত্তি (এনওসি) নিতে হয়। সেই বাধ্যবাধকতা এড়াতেই বেনজীর আহমেদ নিজের পেশা গোপন করে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন। এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার মোট সাতটি পাসপোর্টের সন্ধান পায় এবং এ নিয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করে। বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পর্তুগালের পাসপোর্টধারী।

এদিকে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হলেও তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে কোথায় তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনো কোনো সূত্র দাবি করেছেম তারাও দুবাইয়ে আছেন। বেনজীর আহমেদ দুর্নীতির মাধ্যমে যে সম্পদ অর্জন করেছেন, তার একটি অংশ দুবাইয়ে পাচার করেছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বেনজীর আহমেদের নামে দুটি সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। এই দুটি সম্পদ কেনা হয়েছে ২০২৩ সালের ১২ জুন। প্রতিটি সম্পদের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।

এর আগে গত বছরের ১২ মে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে থাকা দুটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। এ ছাড়া তার নামে থাকা দুটি ব্যাংক হিসাবও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের স্ত্রীর নামে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। অ্যাপার্টমেন্টটি কেনা হয়েছিল ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি। অন্য অ্যাপার্টমেন্টটি দুবাই অল ওয়াসল আবাসিক এলাকায়। এই অ্যাপার্টমেন্ট কেনা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৭ মে।