দেশে কোটিপতি ১৪১৫৬২

জিয়াদুল ইসলাম।।
ব্যাংকে কোটিপতি আমানত হিসাব দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব হিসাবে জমা টাকার পাহাড়ও বড় হচ্ছে। চলতি বছরের জুন শেষে দেশে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে— এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যাংক হিসাবের মাত্র দশমিক ০৭৭ শতাংশ হিসাবে রয়েছে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে এ ধরনের বড় আমানতের হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। আর আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। মূলত কোটিপতি হিসাব ও বড় অঙ্কের আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা একদিকে ব্যাংক খাতে অর্থের জোগান বাড়ার ইঙ্গিত দিলেও, বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির চিত্রও তুলে ধরে। কারণ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
দেশে কোটিপতির প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে আমানতকারীর ব্যাংক হিসাব থেকে এ বিষয়ে একটি ধারণা করা যায়। বাস্তবে কোটিপতির সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কেবল যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে কোটি টাকার বেশি জমা আছে, সেই সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ব্যাংকে থাকা মোট কোটিপতি আমানত হিসাবের প্রায় ২৮-২৯ শতাংশ ব্যক্তি শ্রেণির। বাকি হিসাবগুলো প্রতিষ্ঠানের। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোটিপতি আমানত হিসাব বাড়ার পেছনে আয় ও সম্পদ বৈষম্যের পাশাপাশি কর ও ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতাও ভূমিকা রাখছে। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে কোটিপতির সংখ্যা বাড়া স্বাভাবিক হলেও অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে ব্যাংক খাতের বড় অংশের আমানত কেন্দ্রীভূত হওয়া উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে ব্যবসা ও উৎপাদনে অর্থের ব্যবহার কমে গেলে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যাংকে পড়ে থাকায় বড় অঙ্কের আমানতও বাড়তে পারে। এ জন্য উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় এবং কার্যকর প্রগতিশীল করনীতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়া অর্থনীতির আকার ও মানুষের আয়-সম্পদ বাড়ার স্বাভাবিক ফল হতে পারে। তবে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের বড় অংশ অল্পসংখ্যক কোটিপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, কর ও ভ্যাট ফাঁকির কারণে উচ্চ আয়ের মানুষের সম্পদ দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে ব্যাংকে পড়ে থাকাও কোটিপতি
আমানত বাড়ার একটি কারণ হতে পারে। তবে যারা বেশি আয় করছেন, তাদের কাছ থেকে সরকার যথাযথভাবে রাজস্ব আদায় করতে পারছে কিনা, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রগতিশীল করনীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে বেশি সম্পদশালীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ৩০ জুন শেষে সব ব্যাংক মিলে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি ১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব স্থিতির হিসাবগুলোতে জমা ছিল ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে থাকা বিপুলসংখ্যক ছোট ও মাঝারি হিসাবের চেয়ে তুলনামূলক অল্পসংখ্যক বড় হিসাবেই রয়েছে আমানতের বড় অংশ।
তিন মাসে বেড়েছে ৫ হাজারের বেশি হিসাব : চলতি বছরের মার্চ শেষে ১ কোটি ১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব আমানত হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে বড় আমানতের হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। শতকরা হিসাবে এ বৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা বা প্রায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। গত মার্চ পর্যন্ত এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ টাকা। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি ১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব আমানত হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে ছয় মাসে বড় আমানতের হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ৫১৮টি। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৩৯ হাজার ২৯০ কোটি বা ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে বড় আমানতের হিসাব ও টাকার পরিমাণ বাড়লেও মোট আমানতের তুলনায় এ হিসাবগুলোর অংশ সামান্য কমেছে। ডিসেম্বর শেষে মোট আমানতের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ ছিল ১ কোটি টাকার বেশি স্থিতির হিসাবে। মার্চে তা ছিল ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং জুনে ৩৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের আমানতও কম নয় : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় অঙ্কের আমানতের হিসাবগুলো আরও কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত। ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির হিসাব রয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৫০টি। এসব হিসাবে রয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩২৯ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হিসাব রয়েছে ১৪ হাজার ৩১৫টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। ১০ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হিসাব রয়েছে ৪ হাজার ৮৩৪টি; এসব হিসাবে রয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ হাজার ৯৭টি হিসাবে রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার ১৪৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৩৭০টি হিসাবে রয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৮৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা ২ হাজার ৭৪টি। এসব হিসাবেই জমা রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতি বড় অঙ্কের এসব হিসাবেও ব্যাংক খাতের মোট আমানতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
কোটিপতি হিসাব বাড়ার দীর্ঘ ইতিহাস : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ১৯৭২ সালে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫টি। এর পর ১৯৭৫ সালে ৪৭ জন, ১৯৮০ সালে ৯৮টি হিসাব, ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি কোটিপতি হিসাব বা অ্যাকাউন্ট ছিল। এর পর ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৬৩টি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২০ সালে এ ধরনের হিসাব সংখ্যা ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি, ২০২১ সালে এক লাখ ৯ হাজার ৭৬টি, ২০২২ সালে এক লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি, ২০২৩ সালে এক লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টি, ২০২৪ সালে এক লাখ ২১ হাজার ৩৬২টি এবং ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি।।

























