যমুনার দুর্গম চরে জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
একসময়ের গ্রামবাংলার জনপ্রিয় বাহন ঘোড়ার গাড়ি যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে সমতল থেকে প্রায় বিলুপ্ত হলেও সিরাজগঞ্জের যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে আজও তা জীবন ও জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে। নদীবেষ্টিত ও বালুময় পথের কারণে যেখানে কোনো আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল সম্ভব নয়, সেখানে চরবাসীর পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী এই ঘোড়ার গাড়ি।
বর্ষা মৌসুমে নৌকাই চরাঞ্চলের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশাল বালুচর পেরিয়ে পথচলাই চরবাসীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পৌঁছাতে এই বাহনটির বিকল্প নেই। শহর থেকে নৌকায় করে নদী পার করে আনা বিভিন্ন দ্রব্যাদি ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরের চরের হাটে-বাজারে কিংবা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।
বহু বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার চালানো সত্তরোর্ধ্ব চালক আনছার আলী ও মেছড়া গ্রামের হোসেন আলী জানান, খেতের ফসল ঘরে তোলা থেকে শুরু করে হাটে বিক্রির জন্য নেওয়া—সব কাজই করতে হয় ঘোড়ার গাড়িতে। এছাড়া চরের নদীপারের ব্যবসায়ী শমশের আলীর মতো স্থানীয় ক্ষুদ্র বিক্রেতারা জানান, তাঁদের দোকানের মালামাল বহনে নিয়মিত এই বাহনটির ওপরই নির্ভর করতে হয়।
চৌহালীর তেগুরি চরের ঘোড়ার গাড়িচালক আব্দুল আলিম বলেন, “প্রায় এক যুগ ধরে এই পেশায় আছি। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা আয় হয়, যার মধ্যে ২০০-২৫০ টাকা ঘোড়ার খাবারের পেছনে খরচ হয়ে যায়। বাকি টাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন কেটে যায়।”
বিষয়টি নিয়ে সিরাজগঞ্জ সদরের কাওয়াকোলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জামাত আলী মুন্সি বলেন, যমুনার তীরবর্তী বালুময় এবং বন্ধুর মেঠোপথে ভারী পণ্য পরিবহনের জন্য একমাত্র কার্যকর সমাধান হচ্ছে এই ঘোড়ার গাড়ি। আধুনিক নগরায়ণের মধ্যেও চরাঞ্চলের ভৌগোলিক চাহিদার কারণে বাহনটি তার প্রয়োজনীয়তা ধরে রেখেছে।
সন্ধ্যা নামলে যমুনার বুকে নৌকার চলাচল স্থিমিত হয়ে এলেও চরের বালুপথে চাকা ঘুরতে থাকে এসব ঘোড়ার গাড়ির। কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য এখন সিরাজগঞ্জের যমুনার হাজারো মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে টিকে আছে।



















